লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানেই যেন ব্রাজিল। আর বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলের নাম প্রথম সারিতে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। সর্বোচ্চ পাঁচবার শিরোপা জিতেছে তারা এবং একমাত্র দল হিসেবে বিশ্বকাপের আগের ২২টি আসরের সবকটিতেই খেলেছে সেলেসাওরা।

তবে তাদের গৌরবময় ইতিহাসের মাঝেও একটি দীর্ঘ অপেক্ষা রয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে ইয়োকোহামায় ২০০২ সালে জেতা পঞ্চম শিরোপার ২৪ বছর পূর্ণ হবে। এরপরের পাঁচটি বিশ্বকাপের মধ্যে চারবারই তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোতে পারেনি।

এবার কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে আবারও বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। অপটার সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেই স্বপ্ন পূরণের সম্ভাব্য পথটিও বেশ আকর্ষণীয়। ১৯৮২ সালের পর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিজেদের গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউট পর্বে উঠেছে ব্রাজিল। এবারও হয়েছে তাই। 

শেষ ৩২ জাপানকে হারই রাউন্ড অব সিক্সটিনে যাবার সম্ভাবনা ছিল ৬২.১ শতাংশ। ইতিহাসও ছিলো ব্রাজিলের পক্ষেই। জাপানের বিপক্ষে ১৪ ম্যাচে ১১টি জয়, ২টি ড্র এবং মাত্র ১টি নিয়ে হার মাঠে নামে সেলেসাওরা। আর ম্যাচ জিতে নেয় শেষ মুহূর্তের গোলে। 

শেষ ১৬ সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: নরওয়ে এরলিং হালান্ডকে সামনে রেখে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে নরওয়ে। শেষ ষোলোতে তারাই হতে পারে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ। দুই দলের একমাত্র আগের দেখাটি ছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। সেখানে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল নরওয়ে।

তবে শেষ ষোলোর মঞ্চে ব্রাজিলের রেকর্ড দুর্দান্ত। এই রাউন্ডে ১০ বারের মধ্যে ৯ বারই তারা পরের ধাপে উঠেছে। টানা শেষ আটটি শেষ ষোলোর ম্যাচও জিতেছে সেলেসাওরা। ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে তাদের রেকর্ডও শতভাগ। ১৯৮৬ সালে পোল্যান্ডকে ৪-০ এবং ২০০২ সালে বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা।

কোয়ার্টার ফাইনাল সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: ইংল্যান্ড

এখান থেকেই শুরু হতে পারে আসল পরীক্ষা। অপটা সুপার কম্পিউটারের ২৫ হাজার সিমুলেশন বলছে, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা ১১.৪ শতাংশ। শুধু স্পেন ও ফ্রান্স তাদের চেয়ে এগিয়ে।

তবে ইতিহাস ব্রাজিলকে সাহস জোগায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ১২ ম্যাচে মাত্র একবার হেরেছে তারা। জিতেছে ৫টি, ড্র করেছে ৬টি। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারবারের দেখায় একবারও হারেনি ব্রাজিল। শেষ তিনটি ম্যাচই জিতেছে তারা। এর মধ্যে ২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে রোনালদিনিয়োর সেই অবিস্মরণীয় ফ্রিকিক গোল এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা কঠিন হলেও, সেমিতে যাবার সম্ভাবনা প্রবল আনচেলত্তির দলের। 

সেমি ফাইনাল সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: আর্জেন্টিনা

ইংল্যান্ডকে হারাতে পারলে সামনে অপেক্ষা করতে পারে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুই দলের একমাত্র সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৯০ সালে। সেবার ১-০ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে পাঁচটি সেমিফাইনাল খেলেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ব্রাজিলও শেষ সাতটি সেমিফাইনালের মধ্যে ছয়বার ফাইনালে উঠেছে।

২০১৪ সালে নিজেদের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের সেই দুঃসহ পরাজয়ের স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার চেয়ে বড় উপলক্ষ আর কী হতে পারে!

ফাইনাল সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: স্পেন ফাইনালে উঠতে পারলে ব্রাজিলের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ স্পেন। অপটার সুপারকম্পিউটারের হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদারও স্পেন। তাদের সম্ভাবনা ১৬.৫ শতাংশ।

বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হলেও বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে তারা।

ইতিহাসে স্পেনের বিপক্ষেও এগিয়ে ব্রাজিল। ১০ ম্যাচে জিতেছে ৫টি, ড্র করেছে ৩টি এবং হেরেছে মাত্র ২টি। বিশ্বকাপে শেষ চার দেখায়ও অপরাজিত সেলেসাওরা। তবে সেই চারটি ম্যাচই ছিল গ্রুপ পর্বে। ফাইনালের চাপ ও আবহ অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৬.৭ শতাংশ। অন্তত পাঁচটি দেশের সম্ভাবনা তাদের চেয়ে বেশি। তবুও ব্রাজিলের ইতিহাস বলে, সম্ভাবনার হিসাব সব সময় মাঠের ফল নির্ধারণ করে না। আনচেলত্তির হাত ধরে ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কী সেলেসাওরা জিততে পারবে তাদের কাঙ্ক্ষিত হেক্সা, অর্থাৎ ষষ্ঠ বিশ্বকাপ?