মাত্র দুই মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন জান্নাতি খাতুন। এর কিছুদিন পর মাকে হারান। এরপর থেকে তাঁর জীবন ছিল শুধুই বঞ্চনার গল্প। অর্থাভাবে আটকে ছিল বিয়ে। কিন্তু একটি ফেসবুক পোস্ট বদলে দিয়েছে সবকিছু। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে গত শুক্রবার সেই মেয়ের বিয়ে হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার প্রত্যন্ত কলাগাছি গ্রামের তরুণী জান্নাতি বড় হয়েছেন ভ্যানচালক নানা আব্দুল হক ও নানি সুন্দরী বেগমের কাছে।

জানা গেছে, নানা-নানির অভাবের সংসারে ছোটবেলা থেকেই না-পাওয়ার কষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের বয়স হয়েছে, সম্বন্ধও এসেছে। কিন্তু অর্থাভাবে বারবার পিছিয়ে গেছে বিয়ের আয়োজন। নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে অসহায় নানা-নানির কপালে চিন্তার ভাঁজ। যখন চারদিকে শুধু অনিশ্চয়তা, তখন পাশে দাঁড়ান সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস। নিজের ফেসবুক আইডিতে জান্নাতির অসহায় জীবনের গল্প তুলে ধরে সহায়তার আবেদন জানান তিনি। সেই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসেন অসংখ্য হৃদয়বান ব্যক্তি। জান্নাতির বিয়ের আয়োজনের জন্য তাঁরা প্রায় এক লাখ টাকা সহায়তা করেন।

সেই টাকায় রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসি গ্রামের ফিরোজ শেখের সঙ্গে সম্পন্ন হয় জান্নাতির বিয়ে। নতুন জীবনের শুরুতে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই তাঁর। সুখের সংসার গড়তে সবার দোয়া চেয়েছেন তিনি। স্ত্রীকে ভালো রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বামীও।

নানা আব্দুল হক ও নানি সুন্দরী বেগম বলেন, ‘অভাবের কারণে নাতনির কোনো ইচ্ছাই পূরণ করতে পারিনি। সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল বিয়ের খরচ জোগাড় করতে না পারা। কিন্তু অচেনা মানুষের ভালোবাসা আমাদের কষ্টকে আনন্দে পরিণত করেছে। যাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বিয়ের কাজিসহ স্থানীয়রা বলেন, ‘বহু বিয়ে দেখেছি, তবে এতিম জান্নাতির বিয়ে ছিল ব্যতিক্রম। কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। গেট, রঙিন প্যান্ডেল, অতিথিদের জন্য বাহারি খাবারের আয়োজন—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আমেজ। অসহায় এক এতিম মেয়ের বিয়ে ঘিরে এমন আয়োজন দেখে আমরা আনন্দিত। মানবিকতার এমন দৃষ্টান্ত সমাজে ছড়িয়ে পড়ুক।’

স্বেচ্ছাসেবক তারেক শাহরিয়ার জানান, অর্থাভাবে এতিম মেয়ের বিয়ে না হওয়ার খবরে এগিয়ে আসেন সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস। নিজের ফেসবুক আইডিতে জান্নাতির দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে সহায়তা করার আহ্বান জানান সবাইকে। একটি ফেসবুক পোস্ট, কিছু মানুষের আন্তরিকতা আর সামান্য সহযোগিতা—এতেই বদলে যেতে পারে একটি অসহায় মানুষের জীবন, এটি যেন আবারও প্রমাণিত হলো।

বিয়ের উদ্যোক্তা সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘জান্নাতি খাতুনের বিয়ে আর দশটি বিয়ের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। পারলার থেকে কনে সাজানো, খাবার পরিবেশন, উপহার, সাজসজ্জা ছিল চোখে পড়ার মতো। এটা শুধু একটি পারিবারিক আয়োজন নয়; এটি মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দেশ-বিদেশের মানবিক মানুষের সহায়তায় এমন জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।’