এমকে হক, জার্মানি

আজ কোনো তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং বা ক্যারিয়ার গড়ার গল্প নয়; চলুন একটু পেছনের দিনগুলোতে ফিরে যাই। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যারা প্রতি বছর ইউরোপের মাটিতে পা রাখেন, তাদের প্রথম একটি মাস কেমন কাটে?

বিশেষ করে জার্মানি আসার পর প্রথম যেদিন আমরা একা একা এখানকার কোনো বড় সুপারমার্কেটে ঢুকি, তখনকার সেই নার্ভাসনেস আর একাকীত্বের অনুভূতিটা যে কতটা অদ্ভুত আর ভারী, তা কেবল একজন প্রবাসীই বোঝেন। আজ প্রবাস জীবনের একদম শুরুর দিকের সেই নস্টালজিক বাস্তবতার কথাই বলব।

দেশ থেকে প্লেন থেকে নেমে যখন আমরা জার্মানির কোনো একটা অচেনা শহরে নিজের স্টুডেন্ট ডরমিটরি বা অ্যাপার্টমেন্টে এসে উঠি, প্রথম দুই-তিন দিন সবকিছু স্বপ্নের মতো রঙিন লাগে। কিন্তু আসল বাস্তবতাটা আঘাত করে ঠিক তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে- যখন ঘরের দেশি খাবার শেষ হয়ে যায় এবং প্রথমবার একা একা সুপারমার্কেটে পা রাখতে হয়।

চারপাশে সব অচেনা মানুষ, পুরো দোকানের গায়ে সব জার্মান ভাষায় লেখা। পকেটে ইউরো আছে ঠিকই, কিন্তু কোনটা যে কী জিনিস- তা বুঝতেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিতে হয়। এর সাথে যোগ হয় ল্যাঙ্গুয়েজের এক মনস্তাত্ত্বিক ভয়। মনের ভেতর একটা অদ্ভুত শঙ্কা কাজ করে- ক্যাশ কাউন্টারে বসা মানুষটি যদি হুট করে জার্মানিতে কিছু জিজ্ঞেস করে বসে, আমি কী জবাব দেব?

ফ্রোজেন সেকশনে গিয়ে যখন আমরা মনের অজান্তেই রুই মাছ, ওলকপি বা দেশের সেই চেনা মশলাগুলো খুঁজি এবং দিনশেষে না পেয়ে একটা পাউরুটি আর ডিমের প্যাকেট নিয়ে কাউন্টারের দিকে হাঁটা দিই- তখন মনের কোণায় প্রথমবার একটা তীব্র একাকীত্ব এসে ধাক্কা দেয়। মনে হয়, ‘সব ছেড়ে কোথায় আসলাম রে ভাই!’

জার্মানিতে নতুন আসা প্রবাসীদের সুপারমার্কেটের অভিজ্ঞতার কথা বললে প্লাস্টিকের বোতল রিসাইকেল করার বিষয়টিও এক অনন্য নস্টালজিয়া। মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমবার বোতল ঢোকানোর সময় প্রতিটা সেন্টের হিসাব করা, কিংবা দেশ থেকে আসার পর প্রতিটা ইউরোকে মনে মনে টাকায় কনভার্ট করার সেই দিনগুলো আসলে আমাদের এক ভিন্ন রকম জীবনের পাঠ দেয়।

তবে এই অচেনা ভাষার শহরটাই মাত্র এক-দেড় বছরের মাথায় আমাদের নিজের ঘর হয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে আমরা এক হাত দিয়ে ট্রলিতে জিনিসপত্র টানি আর অন্য হাত দিয়ে নিখুঁত জার্মান ভাষায় ক্যাশিয়ারকে বলি হ্যালো, কার্ডে পে করব!। প্রবাস আমাদের শুধু নতুন কোনো ভাষা বা স্কিল শেখায় না, প্রবাস আমাদের এক রাতে ম্যাচিউরড মানুষ বানিয়ে দেয়।

তাই যারা নতুন জার্মানি এসেছেন বা আসার প্রিপারেশন নিচ্ছেন- শুরুর এই ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার আর কালচারাল শক দেখে ভয় পাবেন না। এই সাময়িক নার্ভাসনেসটাই আপনার প্রবাস জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর রূপান্তরের মেমোরি হয়ে থাকবে।

আজ যে সুপারমার্কেটে দাঁড়িয়ে আপনি ভাষা বুঝতে পারছেন না, দুই বছর পর এই মাটিতেই আপনি আপনার ওনারশিপ আর স্বপ্নের ক্যারিয়ার লিড করবেন। প্রবাস আমাদের শুধু একা থাকতে শেখায় না, প্রবাস আমাদের নিজের পায়ে শক্ত করে দাঁড়াতে শেখায়।

এমআরএম