প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় চার মাসের মাথায় মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর করেছেন। তাঁর এই সফর ছিল প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। যদিও সফরটি দুই দেশে ছিল, কিন্তু বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের দিকেই ছিল অনেকের নজর। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এ সফরের ওপর গভীর নজর রেখেছিল।

বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক—উভয় ক্ষেত্রেই উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং চীনের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত সম্পর্কের ওপর ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকবেই। শুধু প্রভাবই নয়, এটি ভারতের ভূরাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

ওপরের বিষয়গুলো উল্লেখ করার কারণ হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে একধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে তৈরি হয়েছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার পরিবর্তন লক্ষণীয়। আমার মত হলো, অধিকাংশ সময় আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত নীতি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় স্বকীয়তা বা কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারিনি। চীনকে ঘিরে উপমহাদেশের আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট। আমি মনে করি, আফগান যুদ্ধ, ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত এবং চীনের অভূতপূর্ব উত্থান উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে যে পরিবর্তন এনেছে, তা আমাদের মতো দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও সামনের কূটনীতি

এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ও পরিবর্তনশীল সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। চীন স্বাধীন বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট স্বীকৃতি দেয় এবং একই বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে প্রথমবার চীন সফর করেন। তাঁকে চীনের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে চীন সফর করেন। এই দুই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামরিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়। ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশ যুক্ত হয় এবং প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা আসে। তবে গত ১৫ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারতকেন্দ্রিক হওয়ায় চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা শীতল ছিল। বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ থাকলেও প্রতিশ্রুত ৪০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়ন প্রকল্পের এ পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। তবে এ নীতির উদ্দেশ্য কোনো দেশের ক্ষতি করা নয়। বরং সবার সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য। আশা করি, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অব্যাহত রাখবে—এটাই দেশের জনগণের প্রত্যাশা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে তাঁর পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমার বিশ্বাস, এ সফর বাংলাদেশের স্বার্থ ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সফরে চীনের সঙ্গে ১৩টি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিষয় নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত স্বাধীনতা, যা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অধিকার। নিকট অতীতে এই স্বাধীনতা অনেকাংশেই খর্ব হয়েছিল বলে মনে হয়েছে।

আমি অন্যান্য বিষয়ে না গিয়ে মূলত দুটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এর একটি হলো মোংলা সমুদ্রবন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, যা প্রতিবেশী দেশের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিষয়টি নতুন নয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য মোংলা বন্দরকে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের উপযোগী করে তোলা। এ জন্য নতুন টার্মিনাল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং ইয়ার্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা-বেইজিং ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ও ঝুঁকির হিসাব-নিকাশ

চীনের সহায়তায় দুটি জেটি ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার) ভিত্তিতে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে চীনের সহায়তা প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকারের। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে বছরে প্রায় চার লাখ টিইইউ (২০ ফুট সমতুল্য কনটেইনার) হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে মোংলা বন্দরে কোনো কনটেইনার বার্থ নেই; বিদ্যমান সব বার্থই বাল্ক কার্গোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই এ সক্ষমতা অনেক আগেই তৈরি করা প্রয়োজন ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে প্রায় ২১৪ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়। একনেকে দ্বিতীয়বার অনুমোদন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পরও চীনের অর্থছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় কাজ শুরু হয়নি। পরে মোংলায় প্রস্তাবিত চীনা ইপিজেড প্রকল্পের সঙ্গে এটি যুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে আরও দুটি কনটেইনার বার্থ নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ভারতের একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় ছিল। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কারণে অন্তর্বর্তী সরকার সে প্রকল্পে আর এগোয়নি।

কাজেই মোংলা বন্দরকে একটি আধুনিক ও আঞ্চলিক বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। আমার মতে, অর্থনৈতিক ও কারিগরি—উভয় দিক থেকেই চীনের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য অধিক সাশ্রয়ী ও কার্যকর। কনটেইনার টার্মিনাল না থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরটি প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকা আয় করেছে এবং প্রথমবারের মতো ৬২ কোটির বেশি উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। বর্তমানে শুধু বাল্ক বার্থ ব্যবহার করেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে। ফলে সম্প্রসারণের পর বন্দরের ব্যবহার ও আঞ্চলিক গুরুত্ব আরও বাড়বে। পাশাপাশি মোংলায় চীনা ইপিজেড শুধু বন্দর নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত করবে।

মোংলা বন্দর ছাড়াও চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত আগের বিসিআইএম উদ্যোগের একটি নতুন সংস্করণ। বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও মিয়ানমারের যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য এ করিডর অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, এপিএম টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গুরুত্ব বহুগুণে বাড়বে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে এ প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এই করিডর বাংলাদেশকে আসিয়ানের সঙ্গেও আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে। উল্লেখ্য, এই অর্থনৈতিক করিডরে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব চীন ভারতকেও দিয়েছে। এটিকে বিসিআইএম উদ্যোগেরই নতুন সংস্করণ বলা যায়।

সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। তবে এ নীতির উদ্দেশ্য কোনো দেশের ক্ষতি করা নয়। বরং সবার সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য। আশা করি, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অব্যাহত রাখবে—এটাই দেশের জনগণের প্রত্যাশা।

  • এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা

    মতামত লেখকের নিজস্ব