সাইদ আহম্মদ, শেকৃবি
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করে সক্রিয় হয়েছে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থী এবং এক শিক্ষক এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারকরা প্রথমে নিজেদের পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) বা কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করেন। এরপর তারা ভুক্তভোগীদের সাম্প্রতিক লেনদেনের সময়, স্থান ও টাকার পরিমাণসহ এমন সব তথ্য নির্ভুলভাবে জানিয়ে বিশ্বাস অর্জন করেন, যা সাধারণত সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও এজেন্ট ছাড়া অন্য কারও জানার কথা নয়।
এরপর জাল টাকা লেনদেনের মামলায় নাম জড়িয়ে যাওয়ার কথা বলে পুলিশ পাঠানো, গ্রেফতার ও আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডসহ (ওটিপি) বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)/ফাইল ছবি
ভুক্তভোগীদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেভেল-১-এর শিক্ষার্থী মাহবুব আহমেদ ফাহিম। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) তিনি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন মিনিবাজারের ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ নামের একটি নগদ এজেন্ট পয়েন্ট থেকে লেনদেন করেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে উল্লেখিত কৌশল প্রয়োগ করে প্রথমে তার কাছ থেকে সাত হাজার টাকা আদায় করেন। পরে তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে একইভাবে আরও ৫৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি।
একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন লেভেল-১-এর আরেক শিক্ষার্থী মোছা. মোবাশ্বিরা মুস্তারিন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মিনিবাজারের একই এজেন্ট পয়েন্ট থেকে ক্যাশ আউট করার পরদিন পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন।
ওই ব্যক্তি দাবি করেন, যে দোকান থেকে মোবাশ্বিরা টাকা তুলেছেন, সেই দোকানদার এক নারীর বিরুদ্ধে জাল টাকা দেওয়ার অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কিন্তু ভুলবশত ওই নারীর ফোন নম্বরের জায়গায় মোবাশ্বিরার নম্বর যুক্ত হয়েছে এবং জাল টাকা লেনদেনের মামলার ভয় দেখিয়ে তার নগদ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। পরে ওটিপি দিতে এবং নিজের নম্বরে টাকা ক্যাশ-ইন করতে বলে প্রতারণার মাধ্যমে তার হিসাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মোট ২০ হাজার ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তিনি জানতে পারেন, একই দোকান থেকে লেনদেন করা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও একই কৌশলের শিকার হয়েছেন।
আরও পড়ুন
শুধু চীনারাই ভাড়া থাকতেন এই ভবনে, মাসে পাচার হতাে ২০০-২৫০ কোটি টাকা
গুজব-প্রতারণা রোধে এফবিআইয়ের সহযোগিতা চাইলেন আইজিপি
প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মিনিবাজারের একই এজেন্ট পয়েন্ট ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ থেকে নগদ হিসাবে লেনদেন করেছিলেন। তাদের দাবি, লেনদেনের পরপরই প্রতারকরা কখন, কত টাকা, কোন মাধ্যমে এবং ঠিক কত সময়ে লেনদেন হয়েছে এসব তথ্য হুবহু জানিয়ে দেয়।- ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ
এভাবেই প্রতারণার শিকার হন শেকৃবির লেভেল-২-এর শিক্ষার্থী সুরাইয়া আফরিন রিশা। তিনি জানান, ল্যাপটপ কেনার জন্য পরিবারের পাঠানো ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের এক শিক্ষকের কাছ থেকে একই কৌশল খাঁটিয়ে প্রতারকরা দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাইবার প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত পুলিশের ছবি ও মোবাইল ফোন নম্বর
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মিনিবাজারের একই এজেন্ট পয়েন্ট ‘বিসমিল্লাহ স্টেশনারি’ থেকে নগদ হিসাবে লেনদেন করেছিলেন। তাদের দাবি, লেনদেনের পরপরই প্রতারকরা কখন, কত টাকা, কোন মাধ্যমে এবং ঠিক কত সময়ে লেনদেন হয়েছে এসব তথ্য হুবহু জানিয়ে দেয়। এতে তাদের সন্দেহ, ওই এজেন্ট পয়েন্টের সঙ্গে প্রতারক চক্রের কোনো না কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে। অন্যথায় এসব গোপনীয় লেনদেনের তথ্য প্রতারকদের হাতে কীভাবে পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট পয়েন্টে গিয়ে দোকান বন্ধ পাওয়া গেছে। এছাড়া মালিকের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সিল-সই জাল করে প্রতারণা, গ্রেফতার ৫
ভারত / পুলিশের সঙ্গে বাটপারি! চাকরি না করেই বেতন তুলেছেন বছরের পর বছর
বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তারাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী
এ ঘটনায় প্রতারকদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরের বিপরীতে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আরফান আলী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তারাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।’
এমডিএসএ/একিউএফ








