বাংলাদেশে আত্মহত্যার ব্যাপকতার সংবাদ আমাদের জন্য আতঙ্কজনক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) সম্প্রতি জানিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে ৭৬ হাজার ৩৬১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের জীবনপ্রদীপ নিজেরাই নিভিয়ে দিচ্ছেন। এই চিত্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমিত হিসাবের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। 

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বা আত্মহত্যার চেষ্টার অনেক ঘটনা আড়ালে পড়ে থাকে বলে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করি। আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাগুলোকে হিসাবে না নিলে এই চিত্রের ব্যাপকতা বোঝা যাবে না। তবু পুলিশের নথিভুক্ত সংখ্যার ঘটনাতেই আমরা উদ্বিগ্ন।

তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী বলে সংবাদে উঠে এসেছে। আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত ইস্যু হিসেবে না দেখে বরং সমাজের গভীরে জন্ম নেওয়া একগুচ্ছ অসুখের আলামত হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের সমাজের গভীরে এক গুরুতর অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে। আমরা মনে করি, এটা সামাজিক অসংগতি, তীব্র প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চরম ঘাটতির এক সমন্বিত প্রকাশ।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার ব্যাপকতা নিয়ে বৈশ্বিকভাবেও দীর্ঘদিন ধরে আলাপ–আলোচনা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকেরা আমাদের জানাচ্ছেন, বর্তমান নয়া উদারবাদী সমাজব্যবস্থায় চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সফলতার নামে তরুণ প্রজন্মের ওপর যে অমানবিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা তাদের একাকিত্ব ও হতাশার অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিষণ্নতাকে আড়াল করার সামাজিক সংস্কৃতিই দিন শেষে তাদের ঠেলে দিচ্ছে আত্মহননের পথে। 

সামাজিক অসুখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের পুরোনো ও ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আজও আত্মহত্যার চেষ্টাকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে আত্মহত্যার চেষ্টা যিনি করছেন, মানসিকভাবে যিনি গভীর সংকটে পড়েছেন, তিনি চাইলেও সহজে সেটা প্রকাশ করতে পারছেন না। যেখানে তাঁর চিকিৎসা ও সহানুভূতি পাওয়ার কথা, সেখানে তাঁকে উল্টো আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার বাস্তবতা রয়েছে। সামাজিক কাঠগড়া ও অপবাদের ভয় তো রয়েছেই। 

আমাদের মনে রাখা দরকার, শাস্তির ভয় দেখিয়ে আত্মহত্যার কারণ উবে যায় না, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি তো ঘটেই না। বরং প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে ভুক্তভোগী নিশ্চিন্তে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম হন। আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা থেকে সরে এলে আত্মহত্যা কমে যাওয়ার নজির দুনিয়াতে রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের এই ফলাফল আসলে আমাদের সামনে পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝাতে সহায়তা করলেও পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। আত্মহত্যা নিয়ে আরও গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক গবেষণা দরকার। বিশেষত হাল জমানায় বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক অসুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাসহ অন্যান্য বিভিন্ন ফ্যাক্টর বা কারণকে তুলে আনা দরকার। 

গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলে কীটনাশক, বালাইনাশক ও অন্যান্য প্রাণঘাতী উপাদানের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে কেবল উপায় বন্ধ করলে কারণ উবে যাবে না। তথ্য সংগ্রহের নির্ভুল ব্যবস্থা, তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা বেশি জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে পৃথক গুরুত্ব দেওয়ার কথা আমাদের সামূহিকভাবে ভাবতে হবে। ব্যক্তির একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা যে কাঠামো উৎপাদন করে যাচ্ছে, সেটার স্থলে পারস্পরিক সংহতি ও মানবিক যোগাযোগভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথাও কল্পনা করতে হবে।