যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াই এখনই প্রকাশ্য রূপ নিতে শুরু করেছে। এই দৌড়ে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, পর্দার আড়ালে এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন দলের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত পররাষ্ট্রনীতি—বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থনের ঐতিহ্যকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অলিন্দে গুঞ্জন থামছেই না। রুবিও শিবির থেকে পরিকল্পিতভাবে এমন গুজবও ছড়ানো হচ্ছে যে, আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ভ্যান্স হয়তো দৌড় থেকে ছিটকে যেতে পারেন বা নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন।

এই রাজনৈতিক আক্রমণের জবাবেই হয়তো গত দুই সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স তাঁর চিরচেনা পাবলিক ইমেজ (সমালোচনা থেকে দূরে থাকা) থেকে বেরিয়ে এসে ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা করে একের পর এক বিস্ফোরক ও সাহসী বক্তব্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েলের প্রতি রিপাবলিকান পার্টির চিরাচরিত এবং শর্তহীন সমর্থনের কট্টর নীতিতেই অনড় রয়েছেন।

ভ্যান্স পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির জন্য সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করেছে। অন্যদিকে, লেবানন সরকারকে ইসরায়েলের শর্ত মেনে চুক্তি করতে বাধ্য করার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন রুবিও।

মূলত রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই ইসরায়েল বিরোধী মুখ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রুবিওর সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন ভ্যান্স। তাঁর লক্ষ্য পরবর্তী প্রেসিডেন্টের দৌড়ে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ তৈরি করা। তিনি নিজেকে এমন সব পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন, যা আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ভ্যান্সের বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শকে একপাশে ঠেলে দিয়ে ভেনেজুয়েলা থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে রুবিওর যুদ্ধংদেহী মনোভাবই জয়ী হয়েছিল। সেই সঙ্গে ট্রাম্পের কাছে রুবিওর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছিল। ইসরায়েলের প্রশ্নে রুবিও জনসমক্ষে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন করেছেন। এমনকি ইসরায়েলের সমালোচনা করায় আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বহিষ্কার করার ফাইলে পর্যন্ত রুবিও নিজের নাম যুক্ত করেছেন।

রুবিওর এই অতি-ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের জবাবেই জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছেন, আমেরিকার প্রো-ইসরায়েল বা ইসরায়েলপন্থীরা দুটি বড় ভুল করছেন। প্রথমত, তাঁরা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ এবং ইসরায়েলের স্বার্থের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ। এই দুটি স্বার্থ কখনোই এক নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দ্বিতীয়ত, তাঁরা ইসরায়েলের যেকোনো নির্দিষ্ট সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম হিসেবে আখ্যায়িত করে গুলিয়ে ফেলছেন। ভ্যান্সের যুক্তি, যদি প্রতিটি সমালোচনাকেই ইহুদিবিদ্বেষ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তবে প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষের আর কোনো অর্থই অবশিষ্ট থাকে না।

এ থেকে বোঝা যায়, রিপাবলিকান পার্টির নীতিনির্ধারক ও এলিটরা এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও ভ্যান্স মূলত দলের ভেতরের সাধারণ ভোটারদের পালস বোঝার চেষ্টা করছেন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির তরুণ ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে। বিশেষ করে ৫০ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।

রিপাবলিকানদের তৃণমূলের এই মানসিকতার কারণে টাকার কার্লসন বা ক্যান্ডেস ওয়েনসের মতো ডানপন্থী জনপ্রিয় কলামিস্ট ও ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন এবং তাঁরা সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন—মার্কিন নীতি আসলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নাকি ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’। অবশ্য ভ্যান্সের জন্য এই পথটি মোটেও সহজ হবে না। কারণ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে সব সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এদিকে ট্রাম্প বর্তমানে নেতানিয়াহুর ওপর কিছুটা অসন্তুষ্ট থাকলেও ২০২৮ সালের মধ্যে এই সম্পর্কের বরফ গলে যেতেই পারে। এ ছাড়া খ্রিষ্টান জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলো রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে এখনো প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং তীব্র ইসরায়েলপন্থী। ফলে তাদের মন জয় করা ভ্যান্সের জন্য এক মস্ত বড় পরীক্ষা। তবুও চলমান ইরান যুদ্ধ এবং মুক্তচিন্তার ওপর ইসরায়েলি লবির নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে মার্কিন জনমতে যে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, জেডি ভ্যান্স একজন চতুর রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবে সেই সুযোগটিকেই লুফে নিতে চাইছেন। তিনি হয়তো এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি নন, তবে রুবিওকে টেক্কা দিয়ে হোয়াইট হাউসের টিকিট পেতে তিনি এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে সওয়ার হতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা