যাঁরা মাকড়সা দেখলেই ভয় পান, তাঁদের জন্য নতুন করে ভয় পাওয়ার কারণ পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত হান্টসম্যান মাকড়সার কথা অনেকেই জানেন। এই মাকড়সা মৃত ইঁদুরকে ফ্রিজের গা বেয়ে ওপরে টেনে তুলতে পারে। এবার গবেষকেরা বলছেন, লোমশ পা-ওয়ালা এই মাকড়সাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা।

হান্টসম্যান পরিবারের এক সদস্য ব্রাউন হান্টসম্যান। মনে করা হচ্ছে, এটি বিশ্বের দ্রুততম মাকড়শা। যুক্তরাজ্য ও জার্মানির একদল বিজ্ঞানী ২৫০টিরও বেশি প্রজাতির মাকড়সার দৌড়ের গতি বিশ্লেষণ করেছেন। যার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির হিসেবে ধরা পড়েছে এটি।

এই মাকড়সার সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৩.৫৯ মিটার। মানে ঘণ্টায় প্রায় ১৩ কিলোমিটার বা ৮ মাইল যেতে পারে এটি। এর আগে সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা হিসেবে পরিচিত ছিল মরক্কোর ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সা, যার সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১.৭ মিটার। অবশ্য ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সা সাধারণভাবে দৌড়ায় না। এরা শরীর উল্টে-পাল্টে গড়িয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে দ্রুত নিচে নামে।

মরক্কোর ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সার সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১.৭ মিটার

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৬২টি ভিন্ন প্রজাতির মাকড়সা সংগ্রহ করেন। এর বেশির ভাগই পাওয়া যায় লন্ডন ও জার্মানির গ্রাইফসভাল্ড শহরের আশপাশে। এ ছাড়া উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও কিছু প্রজাতি সংগ্রহ করা হয়।

মাকড়সা কীভাবে জাল তৈরি করে
এর আগে সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা হিসেবে পরিচিত ছিল মরক্কোর ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সা, যার সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১.৭ মিটার। অবশ্য ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সা সাধারণভাবে দৌড়ায় না।

এরপর বিশেষ ক্যামেরা ও খোপ কাটা কাগজের ওপর মাকড়সাগুলোকে দৌড় করানো হয়। মাপা হয় এদের গতি। ফলাফল হিসেবে পাওয়া গেছে দ্রুতগতির মাকড়সা ব্রাউন হান্টসম্যানের নাম। গবেষণাপত্রটি এরই মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে জমা দেওয়া হয়েছে।

এই গবেষকেরা নিজেরা পরীক্ষা তো করেছেনই, পাশাপাশি আগের বিভিন্ন গবেষণার তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস্টোফার ক্লেমেন্তের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি গবেষণা। সেটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালে। সেই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মাকড়সারা কীভাবে চলাফেরা করে, সেই বিশেষ পদ্ধতি বোঝা। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে তিনি মাঠে নামেননি। বরং যেসব মাকড়সা সহজে পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়েই গবেষণা করেছেন। তাঁর বাড়ির পেছনের উঠানে পাওয়া সাধারণ মাকড়সা নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। রাতে হেড টর্চ নিয়ে বের হলেই ঘাসের ওপর এগুলো দেখতে পেতেন তিনি।

ড. ক্রিস্টোফার ক্লেমেন্তের মতে, মাকড়সারা শুধু পেশির সাহায্যে চলে না। এরা পা ভাঁজ করতে পেশি ব্যবহার করে

তিনি বলেছেন, ‘আমি জানতে আগ্রহী ছিলাম বিভিন্ন আকারের প্রাণী কীভাবে চলাফেরা করে? প্রাণীদের দৌড়ের গতি পেশির কারণে কতটা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে?’

তাঁর মতে, মাকড়সারা শুধু পেশির সাহায্যে চলে না। এরা পা ভাঁজ করতে পেশি ব্যবহার করে। আর পা সোজা করে সামনে এগিয়ে নিতে ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের জলীয় বা হাইড্রোলিক চাপ। অন্য প্রাণীদের চলাফেরার পদ্ধতির তুলনায় এটি সম্পূর্ণ আলাদা।

বেশিরভাগ মানুষ মাকড়সা দেখলে ভয় পায় কেন
ড. ক্রিস্টোফার ক্লেমেন্ত দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে তিনি মাঠে নামেননি। বরং যেসব মাকড়সা সহজে পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়েই গবেষণা করেছেন।

ব্রাউন হান্টসম্যান মাকড়সা কেবল অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলজুড়ে পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডের বাড়িঘরে এটি খুবই পরিচিত মাকড়সা। এটি প্রায় মানুষের হাতের সমান বড় হতে পারে। যদিও এদের বিষ আছে, তবু মানুষকে খুব কমই কামড়ায়। আর কামড়ালেও সাধারণত এর প্রভাব সামান্য।

ড. ক্লেমেন্তে বলেছেন, প্রতি সেকেন্ড ৩.৫৯ মিটার গতি মাকড়সাটি মাত্র এক মুহূর্তের জন্য অর্জন করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এর গড় গতি ছিল প্রায় প্রতি সেকেন্ডে ২ মিটার। সেকেন্ডে ২ মিটারও অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত গতি। প্রাণিজগতে দৌড়ের গতি কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে সুইট স্পট একটি বিষয়। বিষয়টি হলো, সাধারণত গতি নির্ভর করে যখন প্রাণীর পা ও পেশি যথেষ্ট লম্বা হয়, কিন্তু শরীর এমন ভারী হয় না যে সেই ওজন বহন করাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রাউন হান্টসম্যান মাকড়সা কেবল অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলজুড়ে পাওয়া যায়

হান্টসম্যান মাকড়সা সম্ভবত সেই আদর্শ ভারসাম্যের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই মাকড়শা খুব বড় না, আবার খুব ছোটও না। তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গ্রাইফসভাল্ডের গবেষক এবং নতুন গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক জোনাস উলফ বলেন, এটি মাকড়সার দৌড়ের গতি নিয়ে এখন পর্যন্ত পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত তুলনামূলক গবেষণা। তাঁর মতে, একটি মাকড়সার দৌড়ের গতি নির্ধারণ করে সে পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেয়, কত দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রকৃতিতে কোন ধরনের বাস্তুসংস্থানিক ভূমিকা কী?

প্রাণীরাও কি আমাদের মতো ঘুমায়
ড. ক্লেমেন্তে বলেছেন, প্রতি সেকেন্ড ৩.৫৯ মিটার গতি মাকড়সাটি মাত্র এক মুহূর্তের জন্য অর্জন করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এর গড় গতি ছিল প্রায় প্রতি সেকেন্ডে ২ মিটার।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, সবচেয়ে বড় আকারের মাকড়সাগুলোই যে সবচেয়ে দ্রুতগতির হবে, এমন না। আবার জাল পেতে শিকার করা মাকড়সাগুলোও সব সময় ধীরগতির হয় না। গবেষণার তথ্য বলছে, শরীরের ওজন একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে মাকড়শা ধীরগতির হয়। এদের পেশির কার্যক্ষমতা ও দেহগঠনের যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে তখন দৌড়ের গতি কমে। এখন প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি ব্রাউন হান্টসম্যানই পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির মাকড়সা?

ড. উলফের উত্তর হলো, ‘এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পৃথিবীতে এর চেয়েও দ্রুতগতির অন্য কোনো হান্টসম্যান প্রজাতিও থাকতে পারে। শুধু এখনো তাদের পরীক্ষা করা হয়নি।'

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

পান্ডা মাংস না খেয়ে বাঁশ খায় কেন