রাতে ঘুমাতে গেছেন। ঘর অন্ধকার, চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ কানের কাছে ভেসে এল একটা ভনভন শব্দ। হাত বাড়িয়ে মশাটা মারতে গেলেন। কিন্তু ওটা ততক্ষণে উধাও। একটু পর আবার ফিরে এল। এবার হয়তো হাতের আঙুলে, নয়তো পায়ের পাতায় বসে রক্ত খাওয়ার চেষ্টা করছে।
একটা মশা নিয়ে এত কাণ্ড! আকারে এত ছোট যে হাতের এক চিমটিতেই ধরে ফেলা যায়। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীদের সঙ্গে মৃত্যুর হিসাব মেলালে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিই অনেককে পেছনে ফেলে দেবে। হাঙর, কুমির কিংবা সাপের চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী মশা। তবে সরাসরি কামড়ে নয়। মশা যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়, বিপদটা মূলত সেখানেই।
একটি হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতিবছর মশাবাহিত রোগে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী ম্যালেরিয়া। অথচ মশার শরীরে বাঘের মতো শক্তি নেই, সাপের মতো বিষ নেই, কুমিরের মতো ধারালো দাঁতও নেই। মশার অস্ত্র চোখেও দেখা যায় না। মশা শুধু নিরবে রোগ ছড়িয়ে দেয়। এটাই ওদের ক্ষমতা।
আপনি হয়তো জানেন, সব মশা কিন্তু মানুষকে কামড়ায় না। মানুষের রক্ত খায় স্ত্রী মশা। পুরুষ মশা সাধারণত ফুলের মধু ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে। স্ত্রী মশাও মধু খেতে পারে, তবে ডিম তৈরির জন্য তার রক্তের প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি দরকার হয়।
মশা কেন আমাদের রক্ত চুষে খায়পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীদের সঙ্গে মৃত্যুর হিসাব মেলালে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিই অনেককে পেছনে ফেলে দেবে। হাঙর, কুমির কিংবা সাপের চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী মশা।
রক্ত খাওয়ার সময় স্ত্রী মশা সরু, সূচের মতো মুখের অংশ ত্বকের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এই অংশটির নাম প্রোবোসিস। এর সাহায্যে স্ত্রী মশা রক্ত টেনে নেয়। একটি স্ত্রী মশা নিজের ওজনের দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত রক্ত শুষে নিতে পারে।
অবশ্য মশা কামড়ালেই যে আপনার কোনো রোগ হবে, এমন নয়। বেশির ভাগ মশার কামড়ে রোগ ছড়ায় না। কামড়ানোর পর ত্বকে যে ছোট্ট ফোলা দাগ হয়, চুলকায়, তার পেছনে রয়েছে মশার লালা। রক্ত খাওয়ার সময় মশা এই লালা ত্বকের ভেতর ছাড়ে। লালার কিছু উপাদানের কারণে ত্বকে সামান্য অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া হয়। তাই চুলকানি শুরু হয়।

মশার লালায় এমন উপাদান থাকে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। তা না হলে রক্ত টানার সময় রক্ত জমে গিয়ে মশার খাবার সংগ্রহে অসুবিধা হতো। আবার লালার কিছু উপাদান ত্বকে সূচ ফোটানোর অনুভূতিও কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ মশা যখন আপনার রক্ত খেতে আসে, তখন তার শরীর এমনভাবে কাজ করে, যাতে খাবার সংগ্রহ করতে সুবিধা হয়।
কামড়ের জায়গায় চুলকানি সাধারণত নিজে থেকেই কমে যায়। তবে চুলকাতে গিয়ে ত্বক কেটে ফেললে সমস্যা বাড়তে পারে। চুলকানি বেশি হলে উপযুক্ত ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পৃথিবীর সব মশা মেরে ফেললে কি হতোঅবশ্য মশা কামড়ালেই যে আপনার কোনো রোগ হবে, এমন নয়। বেশির ভাগ মশার কামড়ে রোগ ছড়ায় না। কামড়ানোর পর ত্বকে যে ছোট্ট ফোলা দাগ হয়, চুলকায়, তার পেছনে রয়েছে মশার লালা।
মশা রোগ ছড়ায় কীভাবে
একজন অসুস্থ মানুষের রক্ত থেকে রোগজীবাণু মশার শরীরে ঢুকতে পারে। পরে সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে জীবাণু তার শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এভাবে মশা এক মানুষের কাছ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার বাহক হয়ে ওঠে।
মশার মাধ্যমে ছড়ানো রোগের মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসজনিত রোগ এবং আরও কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ। তবে পৃথিবীজুড়ে মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ম্যালেরিয়া বিশেষভাবে ভয়ংকর। এটি হয় প্লাজমোডিয়াম নামের একধরনের পরজীবীর কারণে। এই পরজীবী বহন করতে পারে অ্যানোফিলিস গণের স্ত্রী মশা।
ধরুন, একটি মশা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত কাউকে কামড়াল। রক্তের সঙ্গে পরজীবীও মশার শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এরপর পরজীবী মশার শরীরে বিকশিত হয়ে তার লালাগ্রন্থিতে পৌঁছাতে পারে। সেই মশা যখন আরেকজন মানুষকে কামড়ায়, তখন পরজীবী নতুন মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এভাবেই সংক্রমণ ছড়ায়।

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে জ্বর, কাঁপুনি এবং ফ্লুর মতো নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগটি গুরুতরও হতে পারে; কখনো কখনো মৃত্যুও ঘটে। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, মশা নিজে কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়েও রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। আবার সব মশা সব রোগ ছড়ায় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মশা নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বহন করে।
আরেকটি স্বস্তির খবর আছে। মশার কামড়ে এইচআইভি সংক্রমণ হয়, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ মশা মানুষের রক্ত খেলেও এইচআইভি একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে এভাবে ছড়িয়ে দেয় না।
মশা কামড়ালে চুলকায় কেনধরুন, একটি মশা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত কাউকে কামড়াল। রক্তের সঙ্গে পরজীবীও মশার শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এরপর পরজীবী মশার শরীরে বিকশিত হয়ে তার লালাগ্রন্থিতে পৌঁছাতে পারে।
আপনাকেই কেন বেশি কামড়ায়
একই ঘরে কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। অথচ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, একজনের হাত-পা মশার কামড়ে ভরে গেছে, অন্যজন প্রায় অক্ষত। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। তাহলে কি মশা কাউকে বেশি পছন্দ করে?
মশা তার লক্ষ্য খুঁজে পেতে শ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় এই গ্যাস বের করে। স্ত্রী মশা সেই সংকেত অনুসরণ করে সম্ভাব্য খাবারের উৎসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

তবে শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইড দিয়েই মশা তার লক্ষ্য ঠিক করে না। শরীরের তাপমাত্রা, ঘামের সঙ্গে বের হওয়া কিছু রাসায়নিক পদার্থ এবং রক্তের গ্রুপের কারণেও মশার কাউকে বেশি কামড়াতে পারে। ঠিক কী কারণে কোনো কোনো মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়, তা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের একটি অংশ অন্যদের তুলনায় বেশি মশার কামড়ের শিকার হয়।
তাই আপনার পাশে বসা বন্ধুটিকে মশা বেশি কামড়ালে ধরে নেওয়ার কারণ নেই যে সে অপরিষ্কার। এর পেছনে শরীর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন সংকেতের ভূমিকা থাকতে পারে।
মশা পায়ের পাতায় বেশি কামড়ায় কেনমানুষ ও অন্যান্য প্রাণী নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বের করে। স্ত্রী মশা সেই সংকেত অনুসরণ করে সম্ভাব্য খাবারের উৎসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
মশা তাড়ানোর সব উপায় কি কাজে লাগে
মশা ঠেকাতে বাজারে নানা ধরনের যন্ত্র পাওয়া যায়। কিছু যন্ত্র আলো দিয়ে পোকামাকড় আকর্ষণ করে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে মারে। আবার কিছু যন্ত্র শব্দের মাধ্যমে মশা দূরে রাখার দাবি করে। কিন্তু এসব পদ্ধতি যে মশা নিয়ন্ত্রণে খুব কার্যকর, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বিশেষ করে আলো দিয়ে পোকা মারার যন্ত্রে অনেক উপকারী পতঙ্গও মারা পড়তে পারে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে মশা ধরার ফাঁদ তৈরি করা যায়। তবে শুধু এমন ফাঁদের ওপর নির্ভর করলেও হবে না। মশার সংখ্যা কমাতে ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি সরাতে হবে। এলাকার সবাই মিলে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কারণ, মশার বংশবিস্তারের জন্য জমে থাকা পানির মতো উপযুক্ত জায়গা গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে মশা জন্মানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই ফুলের টব, ফেলে রাখা পাত্র কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে আছে কি না, খেয়াল রাখা দরকার।
মশার কামড় এড়াতে উপযুক্ত প্রতিরোধকও ব্যবহার করা যায়। এ ক্ষেত্রে ডিইইটি ও পিকারিডিন কাজে লাগতে পারে। লেবু ইউক্যালিপটাস তেল থেকে তৈরি পিএমডি এবং আইআর৩৫৩৫-যুক্ত পণ্যও ব্যবহার করা হয়। তবে যে পণ্যই ব্যবহার করুন, তার গায়ে লেখা নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে পণ্যটি তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত কি না, সেটাও দেখে নিতে হবে।
ফুসফুসে কি মশা ঢুকতে পারেকার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে মশা ধরার ফাঁদ তৈরি করা যায়। তবে শুধু এমন ফাঁদের ওপর নির্ভর করলেও হবে না। মশার সংখ্যা কমাতে ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি সরাতে হবে।
মশা অনেক পুরোনো শত্রু
মশার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জুরাসিক যুগ থেকেই পৃথিবীতে মশার অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ এদের বয়স ১৫ কোটি বছরেরও বেশি। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মশার জীবাশ্ম দেখে গবেষকেরা ধারণা করেন, এত দীর্ঘ সময়ে এদের শরীরের গঠনে তুলনামূলকভাবে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।
মশক বা ইংরেজি mosquito শব্দটির উৎস স্প্যানিশ ভাষার mosca থেকে। এর অর্থ মাছি। এর সঙ্গে ছোট বোঝাতে -ito যোগ হলে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ‘ছোট মাছি’।

মানুষের সভ্যতা বদলেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়েছে, রোগ শনাক্ত করার পদ্ধতি আরও উন্নত হয়েছে। তবু মশাবাহিত রোগ এখনো পৃথিবীর বহু মানুষের জন্য বড় বিপদ। মশা এত ছোট যে খালি চোখেই দেখা যায়, কিন্তু এর বহন করা জীবাণু একেকটি জীবন কেড়ে নিতে পারে।
এ কারণে মশাকে শুধু বিরক্তিকর পতঙ্গ হিসেবে দেখলে চলবে না। কানের পাশে ভনভন শব্দ শুনে তাকে তাড়ানো দরকার অবশ্যই, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি মশার বংশবিস্তার রোধ করা, প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক ব্যবহার করা এবং মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা।






