সত্তরের দশকের শেষ দিকে চালু হওয়া বরেন্দ্র রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস একসময় উত্তরবঙ্গের বহু মানুষের কর্মসংস্থান করেছিল। তবে টানা লোকসানে ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালে মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল প্রায় ২৬ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কারখানা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হাত ধরে ১৫ মাস আগে পরিত্যক্ত এই কারখানাতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। এখানে দিন-রাতে আড়াই হাজারের বেশি কর্মী দক্ষ হাতে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ ও লাগেজ। সেই ব্যাগ চলে যাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নামীদামি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে।
সরকারি মালিকানাধীন রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের পাশাপাশি রাজশাহী জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দুইটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। শিগগিরই এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নগরীর সপুরা এলাকার বিসিক শিল্পনগরে একটি বন্ধ বেসরকারি কারখানা ভাড়ায় চালু করেছে গ্রুপটি। এখানে ব্যাগ উৎপাদনে কাজ করছেন প্রায় এক হাজার মানুষ।
সম্প্রতি কারখানা তিনটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেল, রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের কারখানায় শুধু ব্যাগ উৎপাদন হলেও পাটকলের কারখানায় জুতা, তাঁবু ও ছাতা বানানো হচ্ছে। সেই জুতা ও তাঁবু রপ্তানি হচ্ছে। শিগগিরই ছাতা রপ্তানিও হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন ইউনিট চালুর কাজ এগিয়ে চলেছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানালেন, কারখানা তিনটিতে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাঁদের অনেকে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় কাজ করতেন। রাজশাহীতে কারখানা চালু হওয়ায় নতুন চাকরি নিয়ে পরিবার পরিজনসহ চলে এসেছেন। এখন নিজের বাড়িতে থেকে কাজ করছেন। এই বিকেন্দ্রীকরণে রাজধানী ও পাশের সাভার-আশুলিয়া নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে। কর্মীদের মধ্যে একধরনের মানসিক স্বস্তি ফিরেছে।
বর্তমানে নরসিংদী, রাজশাহী, রংপুর ও পাবনায় প্রাণ-আরএফএলের গ্রুপের আটটি জুতা ও লাগেজ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি কারখানা চালু হয়েছে গত ১৬ মাসে। মূলত জুতা ও লাগেজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে তারা। গত দুই বছরে জুতা ও লাগেজ উৎপাদন কারখানায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এমনটাই জানালেন কর্মকর্তারা।
প্রাণ-আরএফএলের গ্রুপের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের জুতা ও লাগেজ রপ্তানি ছিল ৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সেই রপ্তানি বেড়েছে ৯২ শতাংশের বেশি। রপ্তানি হয়েছে ১৭৭ কোটি টাকার জুতা ও লাগেজ।
জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘জুতা ও লাগেজের ভালো ক্রয়াদেশ আসছে। তবে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দ্রুত সমাধান হিসেবে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
বদলে গেছে জীবন
গত ৩০ এপ্রিল সকালে সাবেক রাজশাহী টেক্সটাইল মিলে পৌঁছালে পুরো কারখানাটি ঘুরিয়ে দেখান আরএফএল গ্রুপের জুতা, ব্যাগ, লাগেজ ও তাঁবুর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. রাহাত হোসেন। তিনি জানালেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিটিএমসি থেকে মিলটি বুঝে পান। তারপর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাগের উৎপাদন শুরু হয়।
পুরোনো কারখানা ভবনের ছাদটা বেশ উঁচু। খাঁচকাটা ধাঁচের ছাদে লাগানো গ্লাস দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। ফলে বৈদ্যুতিক আলো লাগছে কম। এদিকে কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শত শত কর্মী। কৃত্রিম চামড়া, ফোম ও কাপড় কাটা থেকে শুরু করে গ্লু লাগানো, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের পর ব্যাগের মোড়কজাতের কাজ করছেন তাঁরা।
কারখানাটিতে অপারেটর পদে কাজ করেন চাঁপা বেগম। আগে গাজীপুরের একটি কারখানায় কাজ করতেন তিনি। তখন তার ছোট্ট মেয়েকে গ্রামে রেখে যেতে হয়েছিল। এখন রাজশাহীর পবা উপজেলার থেকে এখানে কাজে আসেন।
চাঁপা বেগম বললেন, বাড়ির কাছাকাছি ফিরে আসায় তার জীবনযাত্রার খরচ কমেছে। পরিবারের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন আবার গুছিয়ে নিতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মেয়েকে এখন তাঁর কাছে রাখতে পারছেন।

কারখানা চত্বরে একটি গুদামের নির্মাণকাজ চলছে। পাশেই আরেকটি উৎপাদন ইউনিটের কাজ শুরু হবে। আর মাঝখানে থাকা একটি পুকুরের খনন চলছে। এখানে মাছ চাষ হবে। সব মিলিয়ে কারখানাটিতে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন গ্রুপটির কর্মকর্তারা।
কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার রাজীব কবিরাজ বললেন, কারখানার কর্মীরা ভর্তুকি মূল্য ৮ টাকায় দুপুরের খাবার খেতে পারেন। যাঁদের বাড়ি অনেক দূরে, তাঁরা মাসে ২০০ টাকায় ডরমিটরিতে থেকে কাজ করতে পারেন। বর্তমানে দেড় শতাধিক কর্মী ডরমিটরিতে থাকেন।
পরে শ্যামপুরে রাজশাহী পাটকলে গিয়ে দেখা যায়, একটি কারখানা ভবনে জুতা, ছাতা ও তাঁবু উৎপাদন চলছে পুরোদমে। পাশের একটি ভবনের সংস্কারকাজ চলছে। সেখানে সারি সারি মেশিন আমদানি করে রাখা হয়েছে।
১৯৩৯ সালে স্থাপিত এই পাটকলটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিলটি বিজেএমসি থেকে বুঝে পায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারপর ডিসেম্বরে এখানে উৎপাদন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত কারখানাটিতে কাজ করেন ১ হাজার কর্মী। নতুন ইউনিট চালু হলে কর্মসংস্থান গিয়ে দাঁড়াবে ৪ হাজারে, এমনটাই জানালেন কর্মকর্তারা।
কারখানাটির তাঁবুর উৎপাদনে কাজ করেন রাজশাহীর ন্যাশনাল সাইন্স রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজির কলেজের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার। স্বামীর বাড়িতে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছেন তিনি।
জানতে চাইলে শারমিন আক্তার বলেন, ঢাকা বা অন্য কোথাও চাকরি করলে হয়তো পড়াশোনা করতে পারতাম না। বাড়িতে থাকার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারছি। বাড়তি আয়ের কারণে পরিবারেও সচ্ছলতা ফিরেছে।
পণ্য উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ
সরকারি বন্ধ মিল চালু করায় উৎপাদন দ্রুত শুরু করা গেছে বলে জানালেন আরএফএল গ্রুপের জুতা, ব্যাগ, লাগেজ ও তাঁবুর সিওও মো. রাহাত হোসেন। তিনি বলেন, জমি ক্রয়, উন্নয়ন থেকে শুরু করে উৎপাদন শুরু করতে ২ বছরের বেশি সময় লাগে। পরিত্যক্ত কারখানায় আমরা তিন মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু করেছি। এই অবশ্যই বড় একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে রাহাত হোসেন বলেন, মফস্সলে কারখানা করলে স্থানীয় লোকজনের অনেক সহযোগিতা পাওয়া যায়। এখানে যখন আমরা কারখানার কাজ শুরু করি, তখন অনেকে প্রতিদিনই আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন আমরা কবে উৎপাদন শুরু করব। তিনি আরও বলেন, ঢাকার বাইরে মফস্সলে পণ্য উৎপাদনে কর্মীদের বেতন বাবদ কিছুটা সাশ্রয় হলেও কাঁচামাল সরবরাহে খরচ বেশি, তা ছাড়া বিদ্যুতের সমস্যা থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেশি হয়। এখানে সরকারের নজর দিলে শিল্পায়নে গতি বাড়বে। কর্মসংস্থান হবে। রপ্তানি আয়ও বাড়বে।








