অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে রংপুর অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে কিংবা বাড়ির পাশে খালি জায়গাতেও এখন দেখা মেলে কলাগাছ। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই আবাদে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে সঠিক সংরক্ষণাগার ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে, যা এই সম্ভাবনাময় খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অঞ্চলের কলা- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাম্পার ফলনেও কাটছে না হতাশা
রংপুর ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় কমবেশি কলা আবাদ হচ্ছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় সাগর, মালভোগ, চিনি চম্পা ও মেহেরসাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
আরও পড়ুন
আমের চেয়ে বেশি খরচ ক্যারেট-পরিবহনে, বিপাকে চাষিরা
পাহাড়ে আমের ছড়াছড়ি: দাম কমায় ক্রেতা খুশি, লোকসানে চাষি
চাষিরা বলছেন, একবার কলাগাছ রোপণ করলে সেখান থেকে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। অল্প পুঁজিতে ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও এখন কলাচাষে ঝুঁকছেন। তবে বিপত্তি ঘটছে ফসল কাটার পর। কলা একটি দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় ক্ষেত থেকে তোলার পর দ্রুত বাজারে বিক্রি করতে না পারলে তা পচে যায়।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ৪২০৮ হেক্টর জমিতে কলা চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩৫৭ মেট্রিকটন। ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল উৎপাদন হয় আম। যার পরিমাণ ছিল ৫৭৮৫ হেক্টর জমির বিপরীতে ৭০ হাজার ৭০ টন।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রংপুর জেলায় ২২৬০ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ৮৮১৪০ মেট্রিক টন, গাইবান্ধা জেলায় ১১৮৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১২৮৭০ টন, কুড়িগ্রাম জেলায় ৪০৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৩৮৬০ টন, লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৭২০০ টন এবং নীলফামারী জেলায় ৩২৩ হেক্টর জমিতে কলা উৎপাদন হয় ১২১৫৭ টন। ওই পাঁচ জেলায় মোট ৪৩৫৬ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ২২৭ মেট্রিক টন। ওই বছর ৫৭৪৮ হেক্টর জমির বিপরীতে আম উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার ৭৭৪ টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই পাঁচ জেলায় ৪০৭৭ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন।
আরও পড়ুন
লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি
শখের বশে নার্সারি / বছরে ১০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেন কবির হোসেন
এরমধ্যে রংপুর জেলায় ২২৬০ হেক্টর জমির বিপরীতে উৎপাদন হয় ৮৮১৪০ টন, গাইবান্ধায় ৭৪৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১১০৯৩ টন, কুড়িগ্রামে ৪৯৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১৭৮৭০ টন, লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর জমির বিপরীতে ৭৪৭৭ টন এবং নীলফামারী জেলায় ৩৯৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৪৩৩৬ টন।
ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল আম ৫৮০৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ৫৬৪ টন।

এদিকে দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলাতেও প্রতিবছর তিন হাজার থেকে সাড়ে হাজার হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। এসব কলা দিনাজপুরের দশমাইল, রংপুর- ঢাকা মহাসড়কের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জের ফাঁসিতলা হাটে প্রতিদিনই কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের তকেয়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, কলা চাষ করে আমাদের ভাগ্য বদলানোর সুযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু আমরা যখন একসঙ্গে অনেক কলা কাটি, তখন কোল্ড স্টোরেজ বা বিশেষায়িত হিমাগার না থাকায় কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। একটু দেরি হলেই কলা নষ্ট হতে শুরু করে। এতে আশানুরূপ লাভ হয় না।
প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
রংপুর অঞ্চলে কলার বাম্পার ফলন হলেও এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কলার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে কলা থেকে চিপস, জুস বা গুঁড়ো তৈরির মতো কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও প্যাকেজিংয়ের অভাবের কারণে ক্ষেত থেকে কলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারে পাঠানোর সময় একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে চাষিদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কলা কিনে নেয়। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনি করেও কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার পাইকানটারী গ্রামের কলাচাষি সাজু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, এক বিঘা (২৭ শতাংশ) জমিতে উৎপাদন খরচ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ওই পরিমাণ জমিতে ৩০০টি চারা লাগানো যায়। কলা ভালো হলে এক গাদি কলা ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে এক বিঘা জমিতে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। রোজার সময় হলে দাম আরও বেশি হয়।
আরও পড়ুন
ঈশ্বরদীতে জমজমাট লিচুর বাজার, কম দামেও খুশি চাষিরা
বোম্বাই লিচুতে বাজার মাত, রাজশাহীতে ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
সাজু বলেন, তবে কলা একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য। গাছ থেকে পাড়ার পর বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। যদি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা লাভ করা সম্ভব হতো।
ওই গ্রামের কৃষক মোজা মিয়া জানান, বাণিজ্যিকভাবে আবাদ লাভজনকভাবে ধরে রাখার জন্য একটি চারা রোপণ করে তা থেকে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ বার (একবার মূল গাছ থেকে এবং পরে ১-২ বার মুড়ি ফসল থেকে) ফল নেওয়া হয়। এরপর পুরো বাগান উপড়ে ফেলে নতুন করে আবার চারা লাগাতে হয়। কারণ ৩ বারের পর কলার আকার ছোট হয়ে যায় এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ অনেক বেড়ে যায়।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কলাচাষি আনিছুর রহমান বলেন, সাধারণত এই অঞ্চলে গাছ থেকে কলা পাড়ার পর তা পাকলে আমরা খাই। অথবা কাঁচাকলা তরকারি হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু এর বাইরে কলার যে বহুমুখী ব্যবহার সেটা করতে পারি না। এর অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা না থাকা। ফলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলাচাষিরা আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভবান হতে পারছি না।
আনিছুর রহমানের মতে, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের দিক বিবেচনা করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি প্রতিটি বড় কলার হাটের কাছাকাছি হিমাগার বা বিশেষায়িত কালেকশন সেন্টার গড়ে তোলা যায়, তবে কলা চাষে বিপ্লব ঘটে যাবে। এতে শুধু যে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন তা নয়, ভোক্তারাও সারা বছর জুড়ে রাসায়নিকমুক্ত, ফ্রেশ কলা পাবেন একদম ন্যায্য মূল্যে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও করণীয়
ব্যবসায়ী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুর অঞ্চলে কলার আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারে।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট এমদাদুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, শুধু কলা নয়, এই অঞ্চলের আম, লিচু, কাঁঠালসহ অন্য যেকোনো ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই।এই খাতের টেকসই উন্নয়নে এই অঞ্চলে আলাদা শিল্প নীতি গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কলাচাষিদের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক লোন, কলা সংরক্ষণের জন্য উপযোগী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হিমাগার তৈরি করা, কলা থেকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তৈরির প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন, সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে বড় বড় চেইন শপের সংযোগ তৈরি করে দেওয়া, আধুনিক উপায়ে কলা কাটা, প্যাকেজিং এবং প্রাকৃতিক উপায়ে কলা পাকানোর বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে এই কলা জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কলা এমন একটি চমৎকার ফল যা কাঁচা এবং পাকা উভয় অবস্থাতেই নানা পদের সুস্বাদু খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। কাঁচা কলা যেমন পুষ্টিকর সবজি, তেমনি পাকা কলা দিয়ে তৈরি করা যায় চমৎকার সব ডেজার্ট ও স্ন্যাক্স।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, কলার মোচা পরিষ্কার করে কেটে আলু ও মশলা দিয়ে নিরামিষ তরকারি বা মাছ দিয়ে রান্না করা যায়, যা আয়রনের দারুণ একটি উৎস।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি উদ্যোগের সঠিক সমন্বয় ঘটলে রংপুর অঞ্চলের কলা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এফএ/এমএস








