রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তনের গুঞ্জনে সরগরম ব্যাংকপাড়া। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ইঙ্গিত না থাকলেও সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে রদবদল হতে পারে—এমন আলোচনা জোরালো হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর ভেতরেও; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নেতৃত্বে পরিবর্তন হবে কি না, সেটি সরকারের নীতিগত বিষয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন জল্পনা চলতে থাকলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।

ব্যাংকগুলোর একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিশাল মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারের আলোচনার মধ্যেই চার প্রতিষ্ঠানের বর্তমান এমডিদের পরিবর্তন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

বিষয়টির সত্যতা জানতে চাইলে চার ব্যাংকের কোনো শীর্ষ নির্বাহী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এমডি আজকের পত্রিকাকে বলেন, এমন আলোচনা তাঁদের কানেও এসেছে। সরকার চাইলে যেকোনো সময় নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে পারে, সেটি সরকারের এখতিয়ার। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই দীর্ঘদিন এ ধরনের জল্পনা চললে কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়, যার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের কাজেও পড়ে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, চার ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার বিভিন্ন সূচক আগের তুলনায় উন্নতির দিকেই রয়েছে। তারপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের ভাষ্য, বাস্তব চিত্রের বদলে নেতিবাচক প্রচারণা সামনে এনে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হলে তা পুরো খাতের জন্যই নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে রদবদলের একটি প্রচলিত ধারা রয়েছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে তা কর্মকর্তা, গ্রাহক ও বাজার—সব পক্ষের আস্থায় প্রভাব ফেলে। তাই সরকার যদি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। আবার বর্তমান নেতৃত্ব বহাল রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এতে অপ্রয়োজনীয় জল্পনার অবসান হবে এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা দ্রুত দূর করা উচিত। সরকারের উচিত এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানানো, যাতে কর্মকর্তারা স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একই মানদণ্ডে বিচার না করে তুলনামূলক ভালো পারফর্ম করা ব্যাংকগুলোর নেতৃত্ব ও কর্মদক্ষতারও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

যদিও এমডি পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে গত রোববার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উচ্চ হারের খেলাপি ঋণ কমানো এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৯টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। জনগণের অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, পরে কথা বলবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের উন্নয়নে ব্যাংক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাত যোগ্য নেতৃত্বের হাতেই পরিচালিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি নিয়োগের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের। সরকার প্রয়োজন মনে করলে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্বাচন হওয়া উচিত।

বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের এমডি মো. শওকত আলী, জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমান, অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. আনোয়ারুল ইসলাম এবং রূপালী ব্যাংকের এমডি কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম—সবাই ২০২৪ সালে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের মেয়াদ ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। এর আগে তাঁরা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।