দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালিকে গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পর ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম আজ শুক্রবার এ আদেশ দেন। সিএমএম আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো. মোরশেদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডার একটি বাসা থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আজ শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম।

আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আইনজীবীর সঙ্গে গাড়িতে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকের সামনে যান সুখরঞ্জন বালি। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাঁকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি সাদা ডাবল কেবিন গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পরে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁকে দুই মাস নির্যাতন করে একটি গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়।

আবেদনে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর আটক থাকার পর দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সুখরঞ্জনের ছেলে অপূর্ব বালি ভারতে গিয়ে জামিনে বাবাকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী ঘটনার দিন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের দুটি ডাবল কেবিন গাড়িতে করে ফজলুর রহমান ও তাঁর সঙ্গে থাকা সদস্যরা পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের সামনে থেকে সুখরঞ্জন বালিকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাঁকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালি নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তাঁর পরিবার ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালি। অভিযোগে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়া এবং পরে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাঁকে গুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়। অভিযুক্তদের তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুরোধের ভিত্তিতেই ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পেরেছি, ডিবিতে কর্মরত থাকাকালে ফজলুর রহমান ও তাঁর টিম সুখরঞ্জন বালিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে অপহরণের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। সেদিন আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নেওয়ার সময় ফজলুর রহমান সুখরঞ্জন বালির গালে চড়ও মেরেছিলেন।’

শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারের পর ফজলুর রহমানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।