ফুটবলে কেউ আসেন গোল করতে। কেউ শিরোপা জিততে। কেউ আবার প্রজন্মের কল্পনা বদলে দিতে। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে শুধু গোলদাতা বললেও তার গল্প শেষ হয় না। বিশ্ব ফুটবল বর্তমানে বহু বছর ধরে দুই মহাতারকা মেসি ও রোনাল্ডোর আলোয় আলোকিত। এরপর কে? কে হবে নতুন সময়ের মুখ? সেই প্রশ্নের উত্তরে একজন এসেছেন। তার নাম এমবাপ্পে।

এমবাপ্পের খেলায় যারা শুধু গতি দেখেন, তারা আসলে এমবাপ্পের অর্ধেকও দেখেন না। তার সবচেয়ে বড় শক্তি পায়ে বল ছাড়া চলাফেরা। কোথায় জায়গা তৈরি হবে, কখন রক্ষণ লাইনের পেছনে ছুটতে হবে, কখন বল নিতে হবে, কখন এক সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে-এসব এত দ্রুত করেন যে অনেকে বুঝে ওঠার আগেই ম্যাচ বদলে যায়। এমবাপ্পেকে থামানো কঠিন নয়, তাকে ধরতে যাওয়ার আগেই সে অন্য জায়গায় চলে যায়। তার গতি বিস্ফোরক, গোল করার দক্ষতা নিখুঁত, আর বড় ম্যাচে তার ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব তাকে আলাদা করেছে পুরো প্রজন্ম থেকে।

২০১৮ সাল। রাশিয়া বিশ্বকাপ। বয়স মাত্র উনিশ। তখন বলাবলি হচ্ছিল ছেলেটা ভবিষ্যতে বড় কিছু করবে। এমবাপ্পে ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করেননি। তিনি বর্তমানেই নিজের নাম লিখে ফেললেন। পুরো আসরে চার গোল করেন। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার গতির সামনে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ে। ফাইনালেও গোল করেন। ফ্রান্স বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। কৈশোর পেরোনো তরুণ পৃথিবীকে জানিয়ে দেন তার সময় শুরু হয়ে গেছে।

এরপর ২০২২। কাতার বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপ এমবাপ্পেকে মহাকাব্যের চরিত্র বানিয়ে দেয়। পুরো আসরে আট গোল করে জিতে নেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। ফাইনালে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। পৃথিবী অপেক্ষা করছিল মেসির শিরোপা ছোঁয়ার মুহূর্তের জন্য। এমবাপ্পে লড়ছিলেন নিজের দেশের জন্য। ফ্রান্স পিছিয়ে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। শুরু হলো ঝড়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল। অতিরিক্ত সময়ে আবার গোল। বিশ্বকাপের ফাইনালে তিন গোল। ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসাবে এই কীর্তি। ফ্রান্স শিরোপা হারায়; কিন্তু এমবাপ্পে হারেন না। কিছু কিছু রাত শিরোপার নয়, মহত্ত্বের। অনেক হারও মানুষকে কিংবদন্তি বানিয়ে দেয়। ক্লাব ফুটবলে এমবাপ্পে হয়ে ওঠেন আস্থার প্রতীক। পিএসজির হয়ে শুধু শিরোপা জেতেননি, ক্লাব ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। একের পর এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। তরুণ বয়সেই জিতে নেন বিশ্বের সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার। নতুন চ্যালেঞ্জ রিয়াল মাদ্রিদ। বিশ্বের সবচেয়ে চাপের জার্সিগুলোর একটি। এমবাপ্পে সেখানে গিয়েও নিজের পরিচয় বদলাননি। প্রথম মৌসুমেই ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতে ক্লাবের গল্প বদলে দেন।

জাতীয় দলের হয়েও শতাধিক ম্যাচ খেলেছেন। অধিনায়ক হয়েছেন। এখন তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, পুরো ফরাসি ফুটবলের প্রতীক। চলতি বিশ্বকাপে আবারও ফ্রান্সের আক্রমণের ভরসা এমবাপ্পে। নকআউট পর্বে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে তুলেছেন শেষ ষোলোতে। নকআউট পর্বে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে তুলেছেন শেষ ষোলোতে। বড় মঞ্চে বড় হয়ে ওঠার যে বিরল ক্ষমতা, এই বিশ্বকাপেও সেটাই আবার প্রমাণ করেছেন তিনি। বিশ্বকাপ এমবাপ্পের জন্য তার জন্য আলাদা এক জায়গা। চাপ তাকে থামায় না, আরও উজ্জ্বল করে তোলে। সামনে আরও পথ, আরও ম্যাচ, আরও অপেক্ষা। আর এমবাপ্পে আবারও লিখবেন নিজের নতুন অধ্যায়।