১৭৬ বছরে তিনবার নদীভাঙন ও দুইবার ঘূর্ণিঝড়ে সম্পূর্ণ বিলীন হয়েও বার বার ঘুরে দাঁড়িয়ে মেধার বাতি জ্বালানো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নোয়াখালী জিলা স্কুল। তবে মেধা বিকাশের গৌরবময় ইতিহাসের সেই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে অস্তিত্ব বিলীনের দ্বারপ্রান্তে। ধুঁকছে নানা জটিলতায়।
শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার পরিবেশ ৮০ শতাংশই বিলুপ্ত, আছে মাত্র ২০ শতাংশ। ছাত্রদের অভিমত ‘বাহিরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’।
আরও পড়ুন
বগুড়া জিলা স্কুল / ১৭৩ বছরের গৌরবের আড়ালে ধুঁকছে মেধার বাতিঘর
ঐতিহ্যের ধারক
১৮৫০ সালে ইংরেজ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের ১৭টি জেলায় একটি করে জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। তার মধ্যে বাংলাদেশে জিলা স্কুল ছিল ১৪টি, পশ্চিমবঙ্গে ছিল ৩টি। তন্মধ্যে মাত্র ৭.৩৮ একরের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের একটি নোয়াখালী জিলা স্কুল। এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আয়ারল্যান্ডের ইংরেজ কর্মকর্তা মি. জোনসের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল।

বার বার বিলীনেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার আলোকবর্তিকা
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর ১৯২০ সালে এ স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, ফলে ১৯২১ সালে মহব্বতপুর গ্রামের পূর্ব প্রান্তে মন্তিয়ার ঘোনায় স্থানান্তরিত হয় স্কুলটি। বিদ্যালয়টি আবারো নদীভাঙনের শিকার হলে ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি আর. কে. জুবিলী বিদ্যালয়ে একে স্থানান্তর করা হয় ও স্কুলের নামকরণ করা হয় আর. কে. জিলা স্কুল। ১৯৩১ সালে স্কুলটি আবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে, ফলে বিদ্যালয়কে আহম্মদিয়া মাদরাসায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে এর প্রভাতি শাখা চালু হয়।
বিদ্যালয়টি আবারো নদীভাঙনের কবলে পড়লে বঙ্গ বিদ্যালয়ে ও ১৯৪৮ সালে তা বঙ্গবিদ্যালয় থেকে কারামতিয়া মাদরাসায় আনা হয়। ১৯৫৩ সালে কারামতিয়া মাদরাসা থেকে এটি বর্তমান মাইজদী সদরে প্রধান সড়কের পাশে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৮ ও ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়, পরে একে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
আরও পড়ুন
খুলনা জিলা স্কুল / ১৪০ বছরে যে স্কুল গড়েছে প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্রীড়াতারকা
বিখ্যাতদের স্মৃতিবিজড়িত জিলা স্কুল
এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্ররা প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। এরমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক, প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা, সাবেক সচিব প্রয়াত সা’দত হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এএইচ মোফাজ্জল করিম, প্রয়াত শহীদউদ্দীন এস্কান্দার কচি (খেলোয়াড় ও রাজনীতিবিদ), মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান যিনি তিন মেয়াদে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত এবং বঙ্গে এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদ, প্রকৌশলী ফজলুর করিম, প্রয়াত আব্দুর রশিদ (এম.পি), এমাদ উদ্দীন, জামাল উদ্দীন, কর্নেল (অব.) সালাউদ্দীন, ডা. বাহার, প্রফেসর গাজী আহসানুল কবির এবং ওয়েডিং ডায়েরির স্বত্বাধিকারী প্রীত রেজা, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনসহ আরও অনেকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধেও ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ স্কুলের ছাত্রদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন জিলা স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থী অংশ নেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। তাদেরই কয়েকজন ড. শাহাদাত হোসেন সিএসপি, মিজানুর রহমান, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত (বিএলএফ কমান্ডার), এ.কে আযাদ (আযাদ কমিশনার), একরামুল হক, অহিদুর রহমান, জসিম উদ্দীন, ক্যাশ সরকার, বিশ্বেশ্বর দে সহ কয়েকজন শাহাদাত বরণ করেন।
ধুঁকছে মেধার বাতিঘর
সরেজমিনে নোয়াখালী জিলা স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, আবাসিক হোস্টেলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ পরিত্যক্ত এবং কার্যক্রম না থাকায় কয়েক ইঞ্চি ধুলাবালি জমে নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। একাডেমিক ভবনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং শিক্ষক-কর্মচারী সংকটও চরমে।
জানা গেছে, নোয়াখালী জিলা স্কুলে বর্তমানে এক হাজার ২৭০ জন ছাত্র অধ্যয়নরত। এরমধ্যে প্রভাতি শাখায় ৬৫২ ও দিবা শাখায় ৬১৮ জন। শিক্ষকের ৫৩ পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জনের পদ খালি এবং ১০ জন কর্মচারীর পদও শূন্য। তবে বিদ্যালয়টিতে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শতকরা ৯৮.৮৮ শতাংশ এবং ওই বছর জুনিয়র বৃত্তি পেয়েছে ৫১ জন ছাত্র।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়ে অবকাঠামো নেই বললেই চলে। শিক্ষার পরিবেশ ৮০ শতাংশই বিলুপ্ত। বাকি মাত্র ২০ শতাংশ দিয়ে কীভাবে মান ধরে রাখা যায় তা জানি না। এখানে পর্যাপ্ত একাডেমিক ভবন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও আনুষঙ্গিক সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার পরিবেশ অচিরেই বিলুপ্ত হবে।
আরও পড়ুন
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / শিক্ষক সংকটে শতবর্ষের ঐতিহ্যে টান বরগুনা জিলা স্কুলে
বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ স্যাঁতসেঁতে ভবনে বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব পড়ে আছে। ভবনের বাইরে ঘাস জমেছে বুক পরিমাণ আর ভেতরে ধুলাবালির স্তূপে নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। মূল ভবনের তৃতীয় তলায় লাইব্রেরিরও একই অবস্থা। প্রায় ১৩০০ ছাত্রের জন্য মাত্র দুটি শৌচাগার চালু আছে, সেখানেও নোংরা পরিবেশ। বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ফাটল ধরে বৃষ্টির পানি পড়ছে। ছাত্রের অভাবে আবাসিকও দীর্ঘদিন বন্ধ। প্রতি কক্ষে ৫৫-৬০ জন করে ছাত্র ক্লাস করছে।

ছাত্র-শিক্ষকদের ক্ষোভ
সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম বলেন, শিক্ষক নেই, কর্মচারি নেই, ভবন নেই, সীমানা প্রাচীর নেই, ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় টয়লেটও নেই। নেই-নেই, কিছুই নেই। তাহলে এখানে শিক্ষার পরিবেশ থাকবে কীভাবে। সরকার যদি তড়িৎভাবে এসবের সমাধান না করে তাহলে এখানে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
আরেক সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, নতুন ভবন করার কথা বলে আমাদের একটি ভবন ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই স্থানে আর কোনো ভবন এখনো হয়নি। অবকাঠামোর অভাবে বিদ্যালয়টি তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে সকল কার্যক্রম। বার বার পত্র দিয়েও কোনোভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
আবদুর রহমান নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্র জাগো নিউজকে বলেন, স্যাররা অতিরিক্ত ক্লাস নিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। ৪০ মিনিটের ক্লাসে শিক্ষকের আসা-যাওয়ায় ২০-২৫ মিনিটের বেশি সময় থাকে না। আমাদের বিদ্যালয়ের সামনের চাকচিক্যময় একটা গেট ছাড়া কিছুই নেই। বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট অবস্থা।
নোয়াখালী ভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নোয়াখালী রুরাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির (এনআরডিএস) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৬৫ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত আমার এ বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। তখন টিনশেড ঘরে বিদ্যালয়ে পড়ার যে মান ছিল তা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরোনো বন্ধুরা দেশ-বিদেশে নানা পেশায় অবদান রাখছে। প্রতিযোগিতার বাজারে এখন ভঙ্গুর এ শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না।
আরও পড়ুন
যশোর জিলা স্কুল / সংকটেও অম্লান ২০০ বছরের ঐতিহ্য
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বেও আছেন। তিনি বলেন, পৌনে দুইশ বছরের এ স্কুল নিয়ে বহু দপ্তরে লেখালেখি করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। গত ১ জানুয়ারি এখানে যোগদান করেছি। ছয়মাস পর চাকরি থেকে অবসর নেব। আমার সময়ে এ বিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ দিতে পারলে পরবর্তী জীবনে শান্তি পাবো। এজন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করছি।

স্মৃতির পাতায় জিলা স্কুল
নোয়াখালী জিলা স্কুলের ১৯৫৬ ব্যাচের ছাত্র সাবেক সচিব ও হাইকমিশনার (ইউকে, আয়ারল্যান্ড) এএইচ মোফাজ্জল করিম। স্কুলের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক পাসের আগে বাংলাদেশের চারটি স্কুলে পড়তে হয়েছিল আমাকে। ক্লাস নাইনের শেষের দিকে হঠাৎই আমার আব্বা বদলি হয়ে আসেন নোয়াখালীতে। সেটা ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ২২ বা ২৩ তারিখ দীর্ঘ রেলভ্রমণের পর শরতের এক রোদ ঝলমলে দুপুরে আমার মাইজদী কোর্ট রেলস্টেশনে নোয়াখালী আগমন।
তখনকার নোয়াখালী জিলা স্কুলে ওপরে টিনের চাল, পাকা ফ্লোর, ফ্লোরের ওপর চার ফুটের মতো পাঁচ ইঞ্চি ইটের দেওয়াল। এল-প্যাটার্নের এই আধাপাকা দালানই ছিল প্রায় দু’শ ছাত্রের মিলনতীর্থ। ওই এল-প্যাটার্নের পূর্ব দিকের অংশের সর্ব দক্ষিণের কামরা ছিল প্রধান শিক্ষকের। ১৯৫৪-এর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি যখন ক্লাস নাইনে ভর্তি হই তখন টি. হোসেন ছিলেন প্রধান শিক্ষক। তিনি তখন বদলির আদেশপ্রাপ্ত। তারপর আসেন মমতাজউদ্দিন আহমদ এমএ, বিটি। তার মতো স্নেহপ্রবণ, অমায়িক এবং আদর্শ শিক্ষক আমার সারাজীবনে কম পেয়েছি। তিনি ছোট বড় সবাইকে ‘আপনি’ বলতেন। এমনকি সব ক্লাসে তার ছাত্রদেরও। ৫৬ সালে আমাদের ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে তিনি রোজ দুপুরে ইংরেজির কোচিং ক্লাস নিতেন। তার জন্য আমাদের কোনো ফি দিতে হতো না। সহকারী প্রধান শিক্ষক সিরাজুল হক মোল্লা সাহেব ও নরুল হুদা বিএসসি স্যারও কোচিং ক্লাস নিতেন।
হেড স্যারের সঙ্গে আমার আব্বার (আলহাজ্ব মরহুম এরশাদ আলী বিএ বিটি, নোয়াখালীর তৎকালীন জেলা স্কুল ইন্সপেক্টর) ভালো বন্ধুত্ব ছিল। প্রায়ই সন্ধ্যায় একজন আরেকজনের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যেতেন। এই প্রসঙ্গে ৬৬ বছর আগে জিলা স্কুলে ওই সময় যারা আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন, যাদের স্মৃতি আমার হৃদয়পটে চির জাগরূক, তাদের নাম উল্লেখ ও তাদের উদ্দেশে অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম জানাতে চাই। আল্লাহ পাক তাদের সকলকে অনন্ত শান্তিদান করুন।
সেবার (১৯৫৬) নোয়াখালী জিলা স্কুলের কেউ কোনো বিষয়ে লেটার মার্কস পায়নি। এমনকি অঙ্কে পারদর্শিতার জন্য যার উপাধি ছিল যাদব বাবু (সেকালের প্রখ্যাত অঙ্কশাস্ত্রবিদ)। আরেকটি বিষয়েও আমি অল্পের জন্য লেটার মিস করি। সেটি ভূগোল। আমি পেয়েছিলাম ৭৪। আমি ক্লাস নাইনের শেষভাগে নোয়াখালী জিলা স্কুলে এসে দেখলাম ক্লাসের ফার্স্টবয় মাওলানা আমিনুল ইসলাম। হ্যাঁ, মাওলানা। আমিনুল মাদরাসায় আলিম পাস করে এসে স্কুলে ভর্তি হয়। সবাই তাকে তাই মাওলানা ডাকত। বয়সে সে আর সকলের চেয়ে অনেক বড় ছিল। মাওলানা হলেও তার দাড়ি ছিল না, রোজ দাড়ি কামাতো সে। আর আমাদের সবার তখন দাড়ি-গোঁফ উঠি উঠি করছে। এমনিতে সে খুব হাসিখুশি ও ভদ্র ছিল। নাইনের বার্ষিক পরীক্ষায় তাকে ডিঙিয়ে আমি ফার্স্ট হয়ে গেলাম। টেনের সব পরীক্ষাতেও আমি ফার্স্ট আর ও সেকেন্ড হতো।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার ৩-৪ দিনের মাথায় রফিক স্যার নামক একজন শিক্ষকের ফেয়ারওয়েল সভা। সহপাঠীরা ধরলো আমাকে ওই সভায় গান গাইতে হবে। আসলে ওরা দেখেছে আমিও পাগলা হুমাইন্যার মতো মাঝে মাঝেই গুনগুন করি ক্লাসে। গাইলাম। ওটা ছিল আমার প্রিয় একটা উর্দু গজল। আমার বড় ভাই (ডা.) তফজুল করিম বগুড়া জিলা স্কুলের সেরা গায়কদের একজন ছিলেন। তার গলায় গানটি শুনে আমিও নিজে নিজে গাওয়ার সুযোগ খুঁজছিলাম। মৌলা আলী বলে গান শুরু করলাম, অমনি চতুর্দিক থেকে হা হা, হি হি, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে এবার ক্ষ্যামা দেন’ জাতীয় ধ্বনি। আমার তখন কান লাল অবস্থা।
আরও পড়ুন
স্মৃতিপটে জিলা স্কুল / ২০০ বছরের রংপুর জিলা স্কুলের মাঠজুড়ে সাজানো রঙিন শৈশব
৫৬ সালে মার্চ না এপ্রিলে জানি আমাদের ম্যাট্রিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের সিট পড়েছিল সরকারি উমা গার্লস স্কুলে। আমার রোল নম্বর ছিল নোয়া-১। স্যারদের মতে রোল নম্বরের জন্য হয়ত আমাকে খেসারতও দিতে হয়। কারণ প্রত্যেক বিষয়ের পরীক্ষার খাতার বান্ডিলের প্রথম খাতাটি ছিল ১ রোল নম্বরধারীর। পরীক্ষকরা নাকি প্রথম খাতাটি দেখে থাকেন অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে। অন্যান্য পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্রের সঙ্গে তুলনা করারও সুযোগ থাকে না। পাছে ওভারমার্কিং হয়ে যায় সেজন্য নম্বর দেন নিক্তির ওজনে। উর্দু (৭৮), ভূগোল (৭৪), ইতিহাস (৫৭), ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের (৫১) নম্বর দেখে কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না আমি। যা হোক শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফল বের হলো। আমাদের স্কুল থেকে আমরা ৩০ জন পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ৫ জন পেলাম প্রথম বিভাগ, ২০ জন দ্বিতীয় বিভাগ ও ৫ জন তৃতীয় বিভাগ। সেটা ছিল বোধ হয় জুন মাস।
আর ঠিক ওই সময়েই আব্বার বদলির আদেশও এলো। এবার গন্তব্যস্থল রাঙ্গামাটি। একদিন রাতের ট্রেনে আমরা রওনা দিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশে, যাব রাঙ্গামাটি। পেছনে পড়ে রইলো আমার এত ভালো লাগার জিলা স্কুল এবং প্রাণের বন্ধুরা। আজ দুনিয়াতে ওই ব্যাচের মাত্র ছয় জনের সন্ধান পেয়েছি যারা আমার মতো বিমানবন্দরের ডিপারচার লাউঞ্জে বসে প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে, কখন ডাক আসবে। আল্লাহ পাক আমার পরপারে পাড়ি জমানো বন্ধুদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের। বেঁচে থাকুক প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান নোয়াখালী জিলা স্কুল, চির আয়ুষ্মান হোক।
এফএ/এএসএম








