রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার না হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ও বৈদেশিক খাতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করে। আইএমএফের কর্মকর্তা আইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি সরকারের সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতি, সংস্কার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য নতুন তহবিল-সমর্থিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করে।
সফর শেষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আইভো ক্রজনার এক বিবৃতিতে বলেন, এই তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেওয়া হয়েছে। নতুন সম্ভাব্য কর্মসূচির আকার, ঋণের পরিমাণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো আগামী কয়েক মাসে আলোচনা হবে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এসব চ্যালেঞ্জকে আরও তীব্র করেছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বেড়েছে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাওয়ায় আগেই সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী, তারপরও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বহিঃখাতের ভারসাম্য রক্ষায় চাপ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন
‘রাজস্ব-মূল্যস্ফীতি-ব্যাংকিং সংকট নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ’
আইএমএফ জানিয়েছে, এবারের আলোচনা ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ প্রতিবেদনে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকারকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর জন্য রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থা যৌক্তিক করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিময় হার আরও নমনীয় করা এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে আইএমএফ বলেছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের আওতায় ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন করতে হবে। একইসঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে খাতটির দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। এতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে এবং বিনিয়োগে গতি ফিরবে।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক সক্ষমতা সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
আইএমএফের মতে, ব্যাংকিং খাতের চাপ, রাজস্ব চ্যালেঞ্জ এবং বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি একে অন্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
এমএএস/এএমএ








