এআইয়ের যুগে বসে এই শিরোনাম দেখে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ কি আছে? অফিস কিংবা ক্লাসরুম পেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবার ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর। শুধু তা-ই নয়, একেবারে সন্তান প্রতিপালনের মতো সংবেদনশীল জায়গায়। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় সন্তানদের লালনপালনে এআই এখন অনেকটা তৃতীয় অভিভাবক বা থার্ড প্যারেন্ট হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। সন্তানের কল্পনাশক্তি বিকাশের জন্য অনেক অভিভাবকই তাঁদের রূপকথার গল্প শোনান। কিন্তু পরদিন সকালে সেই কল্পনার দৃশ্যগুলো ছবিতে রূপ দিতে সাহায্য নেন মিডজার্নির মতো এআই ইমেজ জেনারেটরের। শুধু গল্প আঁকাই নয়, সন্তানের জন্য বিভিন্ন তথ্য খোঁজা বা খাবারের তালিকা তৈরি করতেও এআই ব্যবহার করছেন অনেকে।
অভিভাবকত্বের এই এআই রূপান্তর এখন শুধু রুটিনমাফিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যেমন প্যারেন্ট হুইস্পারার নামে একটি পরিধানযোগ্য বা ওয়্যারেবল নেকলেস ডিভাইস বাজারে এসেছে। এটি বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যকার কথোপকথন রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করতে পারে। সন্তান কখন রেগে যাচ্ছে বা কাঁদছে, তার গলার স্বর বা টোন দেখে এটি অভিভাবককে সতর্ক করে দেয় এবং কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তার বিশেষজ্ঞ-সমর্থিত পরামর্শও দেয়।
প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে নেই। মেটা পরীক্ষা করছে স্টোরিকিট নামের একটি অ্যাপ। এটি সন্তানদের জন্য নতুন নতুন গল্প বানিয়ে দেয়। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এমন একটি পডকাস্ট ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন, যা পরিবারের ক্যালেন্ডারকে জিপিটির সঙ্গে যুক্ত করে গাড়িতে চলাচলের সময় সন্তানদের প্রতিদিনের সময়সূচি শুনিয়ে দেয়। এমনকি কয়েক দম্পতি নিজেদের ই-মেইল ও অ্যাপস এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে সংযুক্ত করে রাখছেন, যাতে সন্তানকে খেলাধুলা বা স্কুলে পাঠানো নিয়ে একে অপরকে বারবার প্রশ্ন না করতে হয়।
এআই ব্যবহারের ব্যতিক্রমী এক উদাহরণের দেখা মেলে এক নারী কগনিটিভ নিউরোবিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে। কাজের সূত্রে প্রায়ই সফরে থাকতে হওয়ায় তিনি নিজের ১৫ বছর বয়সী ছেলের জন্য তৈরি করেন একটি কাস্টম জিপিটি। নিজের টেক্সট মেসেজ, পারিবারিক মূল্যবোধ ও নিয়মনীতি দিয়ে এটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ছেলেটি মায়ের অনুপস্থিতিতে ঘরের ও স্কুলের নানা বিষয়ে এই মম-বটের পরামর্শ নিত। তবে মজার বিষয় হলো, একদিন সন্ধ্যায় বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেতে সেই ছেলে এই এআই মায়ের সাহায্য নিয়েই তার আসল মাকে রাজি করানোর যুক্তি খুঁজে বের করে এবং সফল হয়!
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, পাঁচ বছরের কম বয়সী সন্তানদের লালনপালনে দেশটির বাবারা প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৭ ঘণ্টা এবং মায়েরা ৩ ঘণ্টা সময় দেন। যেখানে ১৯৬৫ সালে বাবারা মাত্র ১৬ মিনিট এবং মায়েরা এক ঘণ্টার কম সময় দিতেন। বর্তমানে স্কুলের ই-মেইল, হাসপাতাল বুকিং পোর্টাল, স্পোর্টস অ্যাপ ও অভিভাবকদের চ্যাট গ্রুপের অতিরিক্ত তথ্যের চাপ সামলাতেই বাবা-মায়েরা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কাজের চাপ কমালেও সন্তানদের মানসিক স্বস্তি বা কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে নারাজ অনেক বাবা-মা। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান প্রতিপালনে যখনই অভিভাবকেরা মনে করেন, ‘এআই তাঁদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে বা তাঁদের বিকল্প হয়ে উঠছে’, তখনই তাঁদের মনে একধরনের তীব্র অপরাধবোধ ও মানসিক প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ সন্তান লালনপালনের মানসিক চাপ অনেকখানি কমিয়ে দিচ্ছে। তবে সন্তানের আবেগ ও মানবিক যোগাযোগের জায়গাটিতে এআই কোনো দিন বাবা-মায়ের আসল স্পর্শের বিকল্প হতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সূত্র: দ্য চোসুনিলবো, এনআই সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার






