উপসচিব থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কিনতে যে ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে আসছিল সরকার, তা আপাতত বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে সরকারি অফিসের জন্য নতুন গাড়ি কেনাও। একান্ত প্রয়োজন হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা যাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সরকারি ব্যয় কমাতে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। 

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের ব্যয় সংকোচনে গতকাল বুধবার এ–সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এতে নতুন ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সরকারি অর্থে বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। 

সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। পরিচালন বাজেট, উন্নয়ন বাজেট এবং উভয় বাজেটের জন্য আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

এমন নির্দেশনায় কত টাকা সাশ্রয় হবে, সেটি অর্থ বিভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পরিচালন ব্যয় থেকে প্রশিক্ষণ বাবদ ৪ হাজার ৬২৮ কোটি, জ্বালানি তেল বাবদ ৩ হাজার ২৫১ কোটি এবং ভ্রমণ ও বদলি বাবদ ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মূলধন ব্যয় থেকে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ভূমি বাবদ ৬ হাজার ৭৩৩ কোটি, ভূমি উন্নয়ন বাবদ ২০৩ কোটি এবং সরকারি কর্মচারীদের ঋণ বাবদ ৪৩০ কোটি টাকা। 

গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার সুদমুক্ত ঋণ বন্ধসহ ব্যয় সংকোচনে আরও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপর গতকাল পরিপত্র জারি হলো। 

পরিপত্র অনুযায়ী, পরিচালন বাজেট থেকে নতুন কোনো মোটরযান কেনা যাবে না। তবে ১০ বছরের বেশি পুরোনো এবং ব্যবহারের অনুপযোগী যানবাহন প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ফুল ইলেকট্রিক ভেহিকেল (এফইভি) কেনাকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যয়সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে হবে। 

নতুন ভবন নির্মাণেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যেসব আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশের কম সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোতে নতুন ব্যয় নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচালন বাজেট থেকে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থছাড় বন্ধ থাকবে। 

সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণও বন্ধ থাকবে আপাতত। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া যাবে। একইভাবে তাদের অর্থায়নে বিদেশে মাস্টার্স, পিএইচডি ও দীর্ঘমেয়াদি উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। 

সরকারি কেনাকাটায়ও ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদেশে গিয়ে প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) বা ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট (এফএটি) করার পরিবর্তে দেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। 

পরিপত্রে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়িয়ে চলতে হবে। 

যোগাযোগ করলে অর্থ বিভাগের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা পরিপত্র জারির বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় আগেভাগেই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন দেরি হওয়ায় সেই অর্থ বছরের পর বছর পড়ে থাকে। অথচ সরকারকে ওই অর্থের জন্য ঋণের সুদ দিতে হয়। তাই প্রয়োজনের সময়ই ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ অর্থ ছাড় দেওয়া হবে। 

তবে সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়িঋণ বন্ধ থাকার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এতে নতুন পদোন্নতি পাওয়া উপসচিবেরা কিছুটা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন। 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাগরিকেরা ব্যয় সংকোচন করছেন। রাজস্ব সংগ্রহের যে অবস্থা, তাতে এমন নির্দেশনাকে যৌক্তিকই বলতে হবে। তিনি বলেন, ‘সংকোচন অর্থনীতির জন্য সব সময় ভালো নয়। তাই রাজস্ব আদায়ে গতি এলে এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরেকটু ভালো হলে সরকার পরে এই পরিপত্র প্রত্যাহার করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’