তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সংবাদ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাও মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে সংবাদমাধ্যম এখন শুধু তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়; বরং জনমত গঠন, সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক বিশ্বে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সংবাদ ও সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি আমানত, যার মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা, মিথ্যা ও অপপ্রচারের প্রতিরোধ এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন মুসলিম সাংবাদিকের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রতিবেদন এবং প্রতিটি বিশ্লেষণ আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়।

পবিত্র কুরআন সংবাদ পরিবেশনের প্রথম নীতি হিসাবে তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও; অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে, পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।’ (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬)। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও একটি সংবাদ যাচাইয়ের বিষয় জড়িত ছিল। তাফসিরকার ইমাম ইবন কাসির ও ইমাম আল-কুরতুবি উল্লেখ করেছেন, এ আয়াতের মাধ্যমে ইসলামে তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। আধুনিক সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে ফ্যাক্ট-চেকিং বলা হয়, কুরআন বহু শতাব্দী আগেই তার নির্দেশনা দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর-এসব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)। অর্থাৎ অনুমান, গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থি। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। একজন মুসলিম সাংবাদিক কিংবা সাধারণ মুসলমানেরও দায়িত্ব হলো সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য প্রচার না করা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। কেননা মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায় এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (সহিহ আল-বুখারি; সহিহ মুসলিম)। এ হাদিসগুলো সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে। সংবাদে অতিরঞ্জন, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য পরিবেশন ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

ইসলাম মানুষের সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।’ (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)। আবার বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক-এটি কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আন-নুর, ২৪:১৯)। তাই কারও ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয় বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নয় এমন দুর্বলতা প্রচার করে জনপ্রিয়তা অর্জন ইসলামি সাংবাদিকতার আদর্শ হতে পারে না। সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য কেলেঙ্কারি ছড়ানো নয়; বরং জনকল্যাণে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করা।

একজন সাংবাদিক সমাজের চোখ, কান ও বিবেক। তাই তার জন্য নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮)। অর্থাৎ ব্যক্তি, দল, মত বা আদর্শের প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগ যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। একইভাবে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৩)। তাই সত্য গোপন করা, পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন বা অর্থের বিনিময়ে সংবাদ বিকৃত করা ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতের খিয়ানত।

ইসলামে সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমাজ সংস্কার। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।’ (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে; যদি তা না পারে তবে মুখ দিয়ে; তাও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে-এটাই ইমানের দুর্বলতম স্তর।’ (সহিহ মুসলিম)। এ শিক্ষা সাংবাদিকতাকে সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করে। তবে সমালোচনা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক, ন্যায়সংগত ও শালীন হতে হবে; ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে নয়।

ইসলামের ইতিহাসেও তথ্য ও সংবাদ ব্যবস্থার গুরুত্ব সুস্পষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি ও দূত পাঠিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতেন। যুদ্ধের সময় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, চুক্তির আগে বাস্তব অবস্থা যাচাই এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আগে তথ্য নিশ্চিত করার অসংখ্য উদাহরণ সিরাতে পাওয়া যায়। ইবন হিশাম তার আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ এবং ইমাম আত-তাবারি তার তারিখুর রাসূল ওয়াল মুলুক গ্রন্থে এসব ঘটনার বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। এসব থেকে বোঝা যায়, নির্ভুল তথ্য ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়।

সংবাদ পরিবেশনের ভাষাও ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:৮৩)। অন্যত্র বলেন, ‘আমার বান্দাদের বলে দাও, তারা যেন সর্বোত্তম কথাই বলে।’ (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৫৩)। তাই সাংবাদিকের ভাষা হবে শালীন, মার্জিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। উত্তেজনা সৃষ্টি, বিদ্বেষ ছড়ানো বা বিভাজনমূলক ভাষা ব্যবহার ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থি।

আজকের ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ইসলামের নৈতিক নীতিমালা অপরিবর্তিত। একজন মুসলিম সাংবাদিককে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে-তার প্রতিটি শব্দ লিপিবদ্ধ হচ্ছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ কোনো কথা উচ্চারণ করে না, কিন্তু তার কাছে একজন সদা-প্রস্তুত পর্যবেক্ষক তা লিপিবদ্ধ করে।’ (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৮)।

অতএব, ইসলামে সংবাদ ও সাংবাদিকতা শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি সত্য, ন্যায়, সততা, আমানতদারিতা ও মানবকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মহান দায়িত্ব। যে সাংবাদিক আল্লাহভীতি, সত্যবাদিতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেন, তিনি শুধু একজন পেশাজীবী নন; বরং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একজন দায়িত্বশীল কর্মী। বর্তমান সময়ে যখন ভুয়া সংবাদ, অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ, তখন কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত সাংবাদিকতার নীতিমালাই হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক গণমাধ্যম গড়ে তোলার সর্বোত্তম ভিত্তি।