পরীক্ষার আগের রাতে কত কষ্ট করে রাত জেগে পড়া মুখস্থ করলে, কিন্তু পরের দিন পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখলে সব ভুলে গেছ! অথবা, ছোটবেলায় শেখা কোনো প্রিয় কবিতা বা গানের লাইন এখন আর কিছুতেই মনে পড়ছে না। এমনটা অনেকের সঙ্গেই হয়। তবে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। পৃথিবীর সব মানুষের সঙ্গেই এমনটা হয়। কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই কাজ করে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, আমরা যা কষ্ট করে শিখি, তা কেন ভুলে যাই? আর আমরা কি চাইলে ইচ্ছে করে কোনো কিছু ভুলে যেতে পারি? মানুষের জীবনে তো সব স্মৃতি সুখকর হয় না। সুখকর না এমন স্মৃতি কি ভুলে যাওয়া সম্ভব?
আমাদের মস্তিষ্ক কিন্তু স্মার্টফোনের মেমোরি কার্ডের মতো নয় যে যা সেভ করে রাখবে তা চিরকাল সেখানে থেকে যাবে। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন আছে। আমরা যখন নতুন কিছু শিখি, তখন এই নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরি হয়। একে বলে সিন্যাপ্স।
কিন্তু সমস্যা হলো, ব্রেন সব সময় তার শক্তি বাঁচাতে চায়। জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিংহাউস অনেক বছর আগে একটি দারুণ গবেষণা করেছিলেন। সেই গবেষণার নাম ছিল ফরগেটিং কার্ভ। তিনি দেখিয়েছিলেন, নতুন কিছু শেখার পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা তার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভুলে যাই, যদি না সেটা বারবার পড়া হয় বা চর্চা করা হয়। তুমি যদি শেখা জিনিসটা বারবার চর্চা না করো, ব্রেন ভাবে, ‘আরে, এই তথ্যটা তো আর কাজে লাগছে না, তাহলে এটা রেখে ব্রেনের জায়গা নষ্ট করার কী দরকার?’ তখন ব্রেন নিজে থেকেই ওই নিউরনের সংযোগগুলো দুর্বল করে দেয় বা মুছে ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সিন্যাপ্টিক প্রুনিং। ঠিক যেন মেমোরি কার্ড ফুল হয়ে গেলে পুরোনো এবং অদরকারী ফাইলগুলো ডিলিট করে দেওয়ার মতো!
বার্সেলোনায় হেলিকপ্টার থেকে কবিতার বোমাবর্ষণ করেছেন একদল শিল্পীএবার জানার চেষ্টা করি, ইচ্ছে করে কি কোনো কিছু ভোলা সম্ভব? ধরো, তুমি খুব খারাপ একটি অভ্যাস শিখেছ, যা তুমি ভুলতে চাও। এটা কি চাইলেই ভুলে যাওয়া সম্ভব? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, হ্যাঁ, কিছুটা হলেও সম্ভব!
বিজ্ঞানীরা এটি প্রমাণ করার জন্য ল্যাবরেটরিতে বেশ কিছু মজার পরীক্ষা করেছেন। একটি পরীক্ষায় কিছু মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় বেশ কিছু শব্দ মুখস্থ করতে দেওয়া হয়। এরপর তাদের বলা হয়, ইচ্ছে করেই কিছু নির্দিষ্ট শব্দ মাথা থেকে বের করে দিতে বা জোর করে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে। অবাক করা বিষয় হলো, ভবিষ্যতে যখন তাদের সেই শব্দগুলো আবার জিজ্ঞেস করা হয়, দেখা যায়, যে শব্দগুলো তারা ইচ্ছে করে ভুলে যেতে চেয়েছিল, সেগুলো তাদের স্মৃতিতে খুবই ঝাপসা হয়ে গেছে বা প্রায় ভুলে গেছে!
শুধু শব্দ নয়, সম্প্রতি গবেষকেরা দেখেছেন মানুষ চাইলে তাদের অভ্যাসে পরিণত হওয়া আচরণও ভুলে যেতে পারে। ল্যাবরেটরিতে করা গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট শব্দের সঙ্গে হাত বা আঙুলের নির্দিষ্ট নড়াচড়ার যে অভ্যাস তৈরি করা হয়েছিল, মানুষেরা সচেতনভাবে চেষ্টা করে সেটাও ভুলতে পেরেছে।
পরবর্তী মহামারির খবর আগে কে পাবে—মানুষ, না এআই?জীবনের স্মৃতি বা কোনো ঘটনা কি ভোলা যায়
আমাদের জীবনে অনেক খারাপ বা কষ্টের ঘটনা থাকে, যেগুলো আমরা ভুলে যেতে চাই। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, তুমি যদি সচেতনভাবে এবং ইচ্ছে করে তোমার জীবনের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কথা দীর্ঘদিন না ভাবো, তবে আস্তে আস্তে ওই ঘটনার বিস্তারিত তথ্যগুলো তোমার স্মৃতি থেকে মুছে যেতে শুরু করবে। অর্থাৎ, জোর করে কোনো ঘটনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিলে ব্রেন একসময় সেটাকে আর গুরুত্ব দেয় না এবং তার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ভুলিয়ে দেয়।
মাঝেমধ্যে কিন্তু ভুলে যাওয়া আশীর্বাদ! অনেক সময় নতুন কিছু শিখলে আমরা পুরোনো জিনিস ভুলে যাই। আবার পুরোনো স্মৃতি নতুন কিছু শিখতে বাধা দেয়। ব্রেনের এই বদলে যাওয়ার বা নিজেকে নতুন করে সাজানোর ক্ষমতাকে বলে নিউরোপ্লাস্টিসিটি।
সুতরাং, ভুলে যাওয়া মানেই কিন্তু সব সময় খারাপ কিছু নয়। বরং ভুলে যাওয়াটা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই জরুরি একটি প্রক্রিয়া। পুরোনো বা অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলে মস্তিষ্ক নতুন জিনিস শেখার জায়গা তৈরি করে।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথবিড়াল কেন টুনা মাছ এত পছন্দ করে





