শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না। একজন শিক্ষার্থীর মানসিক গড়ন তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগুরু যে অবদান রাখেন, সেটাই তার পরবর্তী জীবনে চলার পথের পাথেয় হয়ে ওঠে। কিন্তু শিক্ষককে হেনস্তা করার যে নানা ফর্মুলা এরই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটাও কারও চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত শিক্ষক হেনস্তার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে। স্কুলে আসে না আর ক্লাসে অমনোযোগী বলে স্কুলের শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধমক দিয়েছিলেন। তারই জের ধরে সেই শিক্ষার্থীর স্বজনেরা এসে একজন শিক্ষিকাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মারধর করেছেন। পুলিশ এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছে বটে, কিন্তু কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
শিক্ষকদের সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের প্রকাশ আমরা বহুবার দেখেছি। গলায় জুতার মালা পরিয়ে শিক্ষকদের অপমান করে আনন্দ করতেও দেখা গেছে। শিক্ষক নিগ্রহের বিষয়টি বিশেষ করে দেখা গিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। সে সময় মব করে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের হেনস্তার যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা নৈতিক অবক্ষয়ের জ্বলন্ত উদাহরণ। একের পর এক শিক্ষকের সঙ্গে এই অবমাননাকর ঘটনা ঘটানো হয়েছে কিন্তু সরকারের তরফ থেকে মৃদু তিরস্কার ছাড়া এই অরাজকতা বন্ধের জন্য কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। পুরো শিক্ষক সমাজের জন্য এটা ছিল এক বিভীষিকার সময়। এখনো যে মব-সংস্কৃতি থেকে শিক্ষালয় মুক্ত হয়নি, তারই উদাহরণ সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতনে শিক্ষিকার ওপর হামলা।
শিক্ষকদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করা নিয়ে কত গল্পই না আছে। পারিবারিক শিক্ষার পর শিক্ষালয়ের শিক্ষাই একটি শিশুর মানস গঠন করে দেয়। কেমন হতে হবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক? আদতে সেই সম্পর্ক কি বিরাজমান? এই প্রশ্ন দুটির উত্তর দিতে হবে। মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মানের ওপর। এই সম্মান ভয় থেকে জন্ম নেবে না, জন্ম নেবে আচরণ ও চারিত্রিক উৎকর্ষ থেকে। শ্রেণিকক্ষ হবে শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ। শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে তোলা, শেখার আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই তো শিক্ষকের কাজ। আরও একটি বড় ব্যাপার রয়েছে। শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করাও শিক্ষালয়ের কাজ। শিক্ষালয় একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল করে তুলতে না পারলে শিক্ষারই কোনো মানে থাকে না।
অথচ আমরা দেখলাম, পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার কারণে ধমক দেওয়ায় তা সেই শিক্ষার্থী সহ্য করতে পারেনি। বাড়িতে ফিরে অভিভাবকদের বলেছে। অভিভাবকেরা বিষয়টি যাচাই করে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। তাঁরা দল বেঁধে গেছেন শিক্ষিকাকে শায়েস্তা করতে!
এমনিতেই আমাদের শিক্ষালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মান সন্তোষজনক নয়। তার ওপর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা যদি কারণে-অকারণে শিক্ষালয়ে মারমুখী হয়ে চড়াও হন, তাহলে শিক্ষার্থীর চেয়ে বরং শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের নৈতিক শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এই প্রশ্নটির উত্তর খুব সুখকর নয়।
ঘটনাটি মোটেই আমাদের সম্মান বাড়াচ্ছে না। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।








