সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোনের সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের মাধ্যমে সরকার ১,২০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। তবে এই সুবিধার সুফল সাধারণ গ্রাহক পাবেন না, বরং পুরো সুবিধাই মোবাইল অপারেটরদের কাছে চলে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকার টেলিকম খাতে একের পর এক কর-সুবিধা দিলেও তার প্রতিফলন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং অপারেটরদের মুনাফাই বাড়ছে। তাই নীতিনির্ধারণে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ানবাজারের বিডিবিএল ভবনে টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিআইপিএপি) উদ্যোগে আয়োজিত ‘টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে বাজেটের প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসিসের সাবেক সভাপতি ও টিআইপিএপির আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর। এতে আরও বক্তব্য দেন বেসিসের সাবেক পরিচালক ও ড্রিম ৭১ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশাদ কবির ও শেয়ার ট্রিপের সিইও সাদিয়া হক। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বেসিসের সাবেক পরিচালক ও বন্ডস্টাইন টেকনোলজি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মীর শাহরুখ ইসলাম।

আরও পড়ুন

মোবাইল ফোন সিমে কর থাকছে না

মাহতাব উদ্দিন বলেন, নতুন সিম বিক্রির ক্ষেত্রে একটি অপারেটরের মোট ব্যয় প্রায় ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা। এর মধ্যে শুধু সিম ট্যাক্সই ছিল ৩০০ টাকা। বাকি অর্থ বিতরণ ব্যয়, খুচরা বিক্রেতার কমিশনসহ অন্যান্য খাতে খরচ হয়। সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের ফলে অপারেটরদের প্রতি সিমে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমে যাবে, যা সরাসরি তাদের আর্থিক সাশ্রয়ে পরিণত হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের বিরোধিতা করছি না। এটি ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই ১,২০০ কোটি টাকার সুবিধা যদি গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক (এসডি) কমানোর মাধ্যমে দেওয়া হতো, তাহলে দেশের মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো।’

এই টেলিকম বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমানে একজন গ্রাহক মোবাইল অপারেটরকে ১০০ টাকা পরিশোধ করলে তার মধ্যে প্রায় ৩৯ টাকাই বিভিন্ন কর হিসেবে সরকারের কাছে যায়। অর্থাৎ টেলিকম খাতে সবচেয়ে বড় করদাতা আসলে গ্রাহক। অথচ এবারের বাজেটে গ্রাহকদের জন্য কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা রাখা হয়নি।

তিনি বলেন, বাজেটে অপারেটরদের জন্য রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স তুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নেটওয়ার্ক সেবার ওপর কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এসব সুবিধা শেষ পর্যন্ত অপারেটরদের মুনাফাই বাড়াবে।

মাহতাব উদ্দিনের দাবি, টেলিকম খাতে মোট করের প্রায় ৭০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের পকেট থেকে আসে। নতুন বাজেট কার্যকর হওয়ার পর এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ডেটার ক্রয়ক্ষমতা বা অ্যাফোর্ডেবিলিটির দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। তাই গ্রাহকের করের বোঝা কমানোই হওয়া উচিত ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

তার ভাষ্য, সাম্প্রতিক টেলিকম নীতিমালায় অপারেটরদের জন্য স্পেকট্রামের মূল্য কমানোসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধার প্রতিফলন গ্রাহক পাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ডেটা প্যাকেজের দাম বেড়েছে।

আরও পড়ুন

বাড়ছে সম্পূরক শুল্ক / মোবাইলে ১০০ টাকা রিচার্জে ৪৪ টাকা ব্যবহার করতে পারবেন গ্রাহক

নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে মাহতাব উদ্দিন বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত সরকারের সঙ্গে তাদের দাবি তুলে ধরতে পারে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে কথা বলার তেমন কোনো সংগঠন নেই। ফলে নীতিনির্ধারণে গ্রাহকের স্বার্থ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।

তিনি বলেন, ‘এসি কক্ষে বসে জনগণের সমস্যা বোঝা সম্ভব নয়। মাঠে গিয়ে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে হবে। তাহলেই কার্যকর ও জনবান্ধব নীতি তৈরি করা সম্ভব হবে।’

স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রসারে আরও উৎসাহ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে সরকারের পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে ফিচার ফোন ও স্মার্টফোনকে একইভাবে বিবেচনা না করে স্মার্টফোনে আরও বেশি কর-সুবিধা দেওয়া উচিত ছিল। কারণ স্মার্টফোনই ফিনটেক, এডুটেক এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত স্মার্টফোনের ওপর করও কিছুটা কমানো প্রয়োজন ছিল। কারণ এখনো দেশের বাজারে অধিকাংশ স্মার্টফোন আমদানিনির্ভর। রাতারাতি স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।’

মূল প্রবন্ধে বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে গিয়ে স্মার্টফোনের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হলে দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে অনেক মানুষের জন্য স্মার্টফোনই প্রধান কম্পিউটিং ডিভাইস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে স্মার্টফোন দিয়েই এখন অফিসের কাজ, ডকুমেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে নানা ধরনের উৎপাদনশীল কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। তাই স্মার্টফোনের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

আরও পড়ুন

সিমে ভ্যাট ও ওটিটি সেবায় শুল্ক প্রত্যাহার চায় এমটব

স্টার্টআপ খাত প্রসঙ্গে ফাহিম মাশরুর বলেন, বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও কর-সুবিধা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবে এসব সুবিধা কতজন উদ্যোক্তা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই স্টার্টআপের জন্য যে সুবিধাগুলো দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন প্রকৃত এবং নতুন উদ্যোক্তারাই পান। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।’

অনুষ্ঠানে বেসিসের সাবেক পরিচালক রাশাদ কবীর বলেন, এনবিআর থেকে ট্যাক্স অব্যাহতি (ট্যাক্স এক্সেম্পশন) সনদ পেতে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কোম্পানিগুলোকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিকভাবে ব্যয় করতে হয়। এটি সংশ্লিষ্ট খাতে একটি ‘ওপেন সিক্রেট’।

তিনি বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সফটওয়্যার শিল্প কর অব্যাহতি সুবিধাপ্রাপ্ত খাত। কিন্তু বাস্তবে সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বড় ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানি বিল পরিশোধের আগে এনবিআরের ট্যাক্স এক্সেম্পশন সনদ চায়। তার অভিযোগ, এই সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিকভাবে খরচ করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি দ্রুত সার্টিফিকেট চান তাহলে টাকা দিতে হয়। না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হবে। বারবার নতুন নতুন কাগজপত্র চাওয়া হবে, কিন্তু সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে না। এটা ওপেন সিক্রেট। একটু খোঁজ নিলেই বিষয়টি জানা যাবে।’

ইএইচটি/এমএমকে