‘বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বিআইজিডি ও প্রথম আলো।
শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য খেলার সুযোগ, সামাজিক ও আবেগময় বিকাশ, নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ (ইসিসিডি) নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। যাতে শিক্ষা, খেলার উপকরণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের জন্য যেভাবে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, তা বন্ধ না হয়। গতকাল সোমবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন।
‘বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে। অনুষ্ঠানে বলা হয়, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিয়ে জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আলাদাভাবে কাজ করা যথেষ্ট নয়। শিশুদের বিকাশে শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও মায়েদের দেওয়া প্রশিক্ষণ যেন কর্মসূচি শেষে হারিয়ে না যায়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে।
বৈঠকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯। এর বাইরে বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসা মিলিয়ে লাখের বেশি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক কোটির বেশি শিশু পড়ছে। প্রাক্–প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের সঠিক বিকাশ হলেই দেশে দক্ষ ও সুষ্ঠু জাতি গড়ে উঠবে। তিনি জানান, সরকার এখন শিশুর সামাজিক উন্নয়ন, আবেগময় বিকাশের দিকে নজর দিচ্ছে। মিড–ডে মিল কার্যকরের পাশাপাশি শিশুদের ইউনিফর্ম, ব্যাগ, জুতা বিনা মূল্যে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, দেশে এখন ১৪ হাজার ৪৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। শিশুর বিকাশে এসব ক্লিনিকে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে ২৭টি বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। তবে দাতাদের চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে। ফলে কাজগুলো তত্ত্বাবধান করা মন্ত্রণালয়ের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। এ জায়গায় সমন্বয়ের ঘাটতি কমানো দরকার। তাঁর মতে, কার্যকর প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিককে গতিশীল করা গেলে চার ভাগের তিন ভাগ শিশুকে এই ক্লিনিক থেকেই সেবা দেওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে বিআইজিডির পরিচালক (অপারেশন, কৌশল ও অংশীদারত্ব) মেহ্নাজ রব্বানী বলেন, ‘ইসিসিডি চলমান রাখতে আমাদের হাতে মডেল রয়েছে, বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, সরকারেরও আগ্রহ রয়েছে। তাই সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ডায়রিয়া প্রতিরোধের মতো সফল কার্যক্রম হয়ে উঠবে ইসিসিডি।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনার্গোজ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এশা হুসাইন। তিনি বলেন, খণ্ডকালীন গবেষণা ও এককালীন কাজ করে বড় অর্জন করা যায় না। ইসিসিডি নিয়ে কেউ গবেষণা, কেউ প্রশিক্ষণের কাজ করছে। তবে এসব কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যারা ইসিসিডি বিষয়ে অর্থায়ন করে, তারাও বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। সবার এখন একসঙ্গে কাজ করার সময় এসেছে।
শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে
আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী জেনা দেরাখশানি হামাদানি বলেন, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে। তাহলে এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি তৈরি হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম হতে পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কমিউনিটি ক্লিনিক। তিনি জানান, তাঁর সংস্থা ৬০০ কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের, শিশুর অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (ব্র্যাক আইইডি) কর্মসূচিপ্রধান সৈয়দা সাজিয়া জামান বলেন, নব্বই দশকের শুরুতে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগে একটি মডেল তৈরি করা হয়েছিল। এই কাজগুলোর অভিজ্ঞতা হারিয়ে দিতে দেওয়া যাবে না। সরকারের দিক দিয়ে জবাবদিহি থাকতে হবে। বদলি হয়ে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তার জায়গায় যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন, তিনি যেন কাজটি অব্যাহত রাখেন।
সিনার্গোজ বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রিজওয়ান আহমেদ খান বলেন, তাঁর সংস্থা পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের কার্যক্রম পালনের সময় দেখেছিলেন, ইসিসিডির গুরুত্ব কতখানি। সকাল নয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত মা–বাবা ব্যস্ত থাকার সময়ে শিশুদের দেখে রাখলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব। সে সময় মায়েদের মধ্য থেকে পালা করে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হতো খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে।
বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের কোষাধ্যক্ষ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক সাইদুর রহমান মাশরেকী বলেন, শিশুর বিকাশে কোন জায়গায় মনোযোগ দিতে হবে ও এসব কার্যক্রমকে কীভাবে টেকসই করা যাবে, তা বুঝতে গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণার ফলাফলকে মূল্য দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত ধারণাপত্রে বলা হয়, ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত হোল চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ডব্লিউসিডি) কার্যক্রমটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এই প্রোগ্রামের আওতায় ব্র্যাক আইইডি ও ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাধ্যমে শেখা, শিশুদের বিকাশ ও অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছে। প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকদের জ্ঞান ও শিখনপদ্ধতিতে উন্নতি দেখা গেছে। তবে শেখা বিষয় কাজে লাগাতে নিয়মিত সহায়তা ও তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সমন্বয়কারী ফারাহ মুনীর।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রামের কর্মসূচিপ্রধান মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন, সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান, ইউনিসেফের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ মোসতান জিদা আলনূর, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মানব উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক তানজিনা দিনা, ফুলকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহলাম আহসান, বিআইজিডির জেন্ডার ও সামাজিক উন্নয়ন ক্লাস্টার প্রধান সহকারী অধ্যাপক শায়লা আহমেদ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইসিডি কর্মসূচির উপদেষ্টা আহসান মাহমুদ, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস কে ফয়সাল হুসাইন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী অ্যানি ড্রং ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরান-উল-বাসেত।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের শুভেচ্ছা জানান প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।







