পাকিস্তান ও সোমালিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে। এতে বাব-আল মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে হর্ন অব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া।

ভৌগোলিকভাবে এই সহযোগিতার গুরুত্ব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বিস্তৃত অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সোমালিয়া মূলত গালফ অব এডেনের প্রবেশপথ, ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। এই জলপথ এশিয়ার বাণিজ্যকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত করে।

লাল ডট অংশটি হর্ন অব আফ্রিকা/ ছবি: গুগোল ম্যাপ

ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এবং সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মুআল্লিম ফিকি এ চুক্তিতে সই করেন। ফিকি সরকারি সফরে পাকিস্তানে গিয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ককে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনা হলো।

চুক্তিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সামরিক প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ বিনিময় এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সোমালিয়ার ক্ষেত্রে জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাবের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের প্রয়োজনীয়তা দেশটির প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব ও বিদেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে রয়েছে।

তবে, চুক্তিটির বাস্তবায়নের সময়সূচি, নির্দিষ্ট সেনা মোতায়েন, অর্থের পরিমাণ বা সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছে ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া। একইভাবে, পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন, স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, অস্ত্র হস্তান্তর বা ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদনের কথাও সমঝোতা স্মারকে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।

সোমালিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ককে বাস্তব প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে পাকিস্তানের জন্য সোমালিয়া হতে পারে আফ্রিকার হর্ন ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। অন্যদিকে সোমালিয়া কোনো একক বিদেশি নিরাপত্তা অংশীদারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সামরিক শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার নতুন উৎস পেতে পারে।

এদিকে, সোমালিয়ার জন্য প্রায় ২৪টি JF-17 Thunder Block III যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে, এই আলোচনা প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক থেকে আলাদা এবং এটিকে এখনো অনুমোদিত ক্রয়চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয়, তাহলে কয়েক দশকের মধ্যে এটি সোমালিয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাইলট প্রশিক্ষণ, বিমানঘাঁটি সংস্কার, অস্ত্র ব্যবস্থার সংযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মতো বড় প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।

উল্লেখ্য, হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকার শৃঙ্গ কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ নয়। এটি আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব দিকের একটি উপদ্বীপীয় অঞ্চল, যা মূলত চারটি প্রধান দেশ নিয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে- সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া এবং জিবুতি। হর্ন অব আফ্রিকার এই অঞ্চলটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝে শিংয়ের মতো বাইরের দিকে প্রসারিত হয়ে আছে বলেই একে হর্ন অব আফ্রিকা বলা হয়।

কেএম