স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় কমাতে ভোটকক্ষপ্রতি ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় সংশোধন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একটি ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ করার চিন্তা করা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানায়, ভোটকক্ষপ্রতি ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো হলে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা, নির্বাচনি জনবল এবং ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। এ কারণেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করছে কমিশন।
এদিকে, ইসির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ এ প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটের ধরন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ালে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পুরুষ ভোটকক্ষে সর্বোচ্চ ৪০০ এবং নারী ভোটকক্ষে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ভোটার রাখার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ভোটকক্ষে ৬০০ ভোটার রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ভোটকক্ষপ্রতি ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ইসির কর্মকর্তারা স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আপত্তি জানান। তারা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের একাধিক পদে ভোট দিতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে আলাদা ব্যালট পেপারে ভোট দিতে হয়। ফলে একজন ভোটারের ভোট দিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় বেশি সময় প্রয়োজন হয়।
ইসির কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার উপস্থিতির হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটি ভোটকক্ষে ৬০০ ভোটার রাখা হলে ভোটারদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ শেষ করা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরীক্ষামূলক ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করছে কমিশন। ৬০০ ভোটার নিয়ে মক ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ শেষ করা সম্ভব কি না এবং মাঠপর্যায়ে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ভোটকক্ষপ্রতি ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি মূলত নির্বাচনি ব্যয় কমানোর চিন্তা থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। এসব বিষয়ে একটি খসড়া তৈরি করে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মধ্যে দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পাশাপাশি বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওতে কর্মরত ব্যক্তিদের চাকরি ছাড়ার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদ, দায়-দেনা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফৌজদারি মামলার তথ্যসংবলিত হলফনামা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন। বর্তমানে সংসদ নির্বাচনে এই তথ্য দেওয়ার বিধান থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা নেই।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজনের সিদ্ধান্ত থাকায় প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ, জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী ব্যয়সীমা পুনর্নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা চলছে।








