পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের নারায়ণপুর মুন্সিপাড়া গ্রামের পাশেই ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ছিট সাকাতি গ্রাম। কাগজে-কলমে এটি ভারতের অংশ হলেও দুই গ্রামের মাঝখানে নেই কোনো কাঁটাতারের বেড়া বা দৃশ্যমান বিচ্ছিন্নতা। সীমান্ত পিলার ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় নেই কোথায় বাংলাদেশ শেষ আর কোথায় ভারত শুরু।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছিট সাকাতি গ্রামের বাসিন্দারা অবাধে বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। অনেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করেন। নিজেদের পরিচয়ও অনেক সময় পাশের নারায়ণপুর মুন্সিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে ব্যবহার করেন। এমনকি, ওই গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিয়েও হচ্ছে বাংলাদেশে। এসব পরিচয়গত জটিলতা থেকেই তৈরি হচ্ছে নানা আইনি সমস্যাও।

এমনই এক জটিলতার শিকার হয়েছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের ছলিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তহিদুল ইসলাম। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পরিচয় গোপন রেখে ভারতের ছিট সাকাতি গ্রামের আফরোজা সরকার সোনালীর সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয় পঞ্চগড় শহরের একটি কাজী অফিসে। বিয়ের পর তহিদুল জানতে পারেন, তার স্ত্রীর প্রকৃত বাড়ি ভারতের অভ্যন্তরে।

দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পরে পারিবারিক কলহের জেরে আফরোজা সরকার সোনালী বাবার বাড়িতে চলে যান। দীর্ঘদিন ফিরে না আসায় ২০১৭ সালের ৬ জুলাই পঞ্চগড়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্ত্রী ও সন্তান উদ্ধারের মামলা করেন তহিদুল ইসলাম। মামলায় আফরোজার ভাই আশরাফ আলী সরকার রুবেলসহ পাঁচজনকে বিবাদী করা হয়।

কিন্তু, মামলার সমন জারি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় আদালত। জারিকারক আদালতকে লিখিতভাবে জানান, নারায়ণপুর মুন্সিপাড়ায় আশরাফ আলী সরকার রুবেল নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে, মামলাটি কার্যত আর এগোয়নি।

এদিকে, ওই মামলার খবর জানার পর ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই আফরোজা সরকার সোনালী চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে স্বামী তহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলার নথিতে তিনি নিজেকে নারায়ণপুর মুন্সিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে মামলাটি হাফিজাবাদ ইউনিয়ন গ্রাম আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে তহিদুল ইসলাম তিন দফা হাজির হলেও বাদী উপস্থিত না হওয়ায় একই বছরের ৪ নভেম্বর মামলাটি নিষ্পত্তি করে গ্রাম আদালত।

স্ত্রীকে ফেরত না পেয়ে এবং মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় একপর্যায়ে তহিদুল ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আফরোজা সরকার সোনালী তার বিরুদ্ধে পঞ্চগড় আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। এ মামলাতেও তিনি নিজেকে বাংলাদেশের নারায়ণপুর মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেন। মামলায় তহিদুল ইসলামকে কারাগারেও যেতে হয়। এক মাসেরও বেশি সময় পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

পরে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল আফরোজা সরকার সোনালী পঞ্চগড় পারিবারিক জজ আদালতে মোহরানা ও খোরপোশের মামলা করেন। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর আদালত রায়ে তহিদুল ইসলামকে স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দীর্ঘদিন তিনি টাকা পরিশোধ করলেও বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে তা চালিয়ে যেতে পারছেন না বলে জানান।

এরইমধ্যে তহিদুল ইসলাম স্ত্রীকে তালাক দেন। পরে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুই কন্যা সন্তানকে ফিরে পেতে তিনি পারিবারিক জজ আদালতে নতুন মামলা করেন। কিন্তু, এবারও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। 

আদালতের জারিকারক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘বিবাদীরা নারায়ণপুর মুন্সিপাড়ায় বসবাস করেন না, তারা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।’ বর্তমানে বিষয়টি চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের তদন্তাধীন রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের ভূখণ্ডে বসবাস করেও বাংলাদেশের ঠিকানা ব্যবহার করে আদালতে মামলা করা সম্ভব হলেও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশি নাগরিক আইনগত প্রতিকার চাইতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নারায়ণপুর মুন্সিপাড়ার শেষ প্রান্তে সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাটের বাড়ির পাশেই সীমান্ত পিলারের ওপারে ছিট সাকাতি গ্রাম। 

সেখানে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আফরোজা সরকার সোনালী বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন এবং তার দুই কন্যা সন্তানও ভারতের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।

তারা জানান, ওই গ্রামের লোকজন অবাধেই দুই দেশে চলাফেরা করেন। সেখানকার অনেক শিশু-কিশোর বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পড়াশোনা করছে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ২০১৩ সালে বিয়ের সময় আফরোজা সরকার সোনালী একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বিয়ের সূত্র ধরে স্বামীর ঠিকানায় তিনি বাংলাদেশের ভোটারও হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী তহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। একের পর এক মামলায় পড়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমি এখন এই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ চাই, আমার সন্তানদের ফিরে পেতে চাই। তারা ভারতে থাকলে আমি তাদের দেখতেও পারব না।”

ওই সীমান্ত এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য জমির উদ্দীন বলেন, “ভারতের ওই এলাকার অনেকেই বাংলাদেশের নারায়নপুর মুন্সিপাড়া এলাকার পরিচয় বহন করেন।”

চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, “ওই গ্রামটি একসময় ছিটমহল ছিল। তখন অনেকেই বাংলাদেশের পরিচয়ে ছিল, বাংলাদেশেই চলাফেরা করত। পরবর্তীতে তাদের কেউ কেউ হয়তো নাগরিকত্ব ধরে রেখেছেন। আমি এ বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজ নেব।”

পঞ্চগড় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান মিলন বলেছেন, “সীমান্তবর্তী এসব এলাকার নাগরিক পরিচয়, ভোটার তালিকা ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের জটিলতা কমবে।”