ঢাকায় টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বসে। জলাবদ্ধতা, যানজট, ভেজা কাপড়, অফিসে পৌঁছাতে দেরি–সব মিলিয়ে বৃষ্টিকে তখন আশীর্বাদের চেয়ে দুর্ভোগই বেশি মনে হয়। এমন সময় হঠাৎ একটি প্রশ্ন মাথায় আসে–পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ বৃষ্টি কত দিন হয়েছিল? সত্যিই যদি এমন এক পৃথিবীর কথা ভাবা যায়, যেখানে বৃষ্টি কয়েক দিন নয়, কয়েক মাসও নয়–বরং এমন এক সময়, যখন পুরো গ্রহটাই ধীরে ধীরে আগুনের গোলা থেকে জলময় পৃথিবীতে রূপ নিচ্ছিল?প্রশ্নটা কল্পনার মতো শোনালেও, এর উত্তর খুঁজতে বহু বছর ধরে কাজ করছেন ভূতত্ত্ববিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গ্রহবিজ্ঞানীরা।প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম। তখন এটি ছিল গলিত শিলা আর অগ্নুৎপাতের এক উত্তপ্ত জগৎ। আজকের মতো নদী, সমুদ্র বা মেঘ–কিছুই ছিল না। পানি ছিল, তবে তরল নয়; ভয়াবহ উত্তাপে তা জলীয় বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়াত।ধীরে ধীরে পৃথিবীর পৃষ্ঠ ঠান্ডা হতে শুরু করে। তাপমাত্রা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন সেই জলীয় বাষ্প আর আকাশে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ঘনীভূত হয়ে তা বৃষ্টিতে পরিণত হয়।এই জায়গায় এসে অনেকের প্রশ্ন–তাহলে কি পৃথিবীতে একটানা বৃষ্টি হয়েছিল?বিজ্ঞানের উত্তর হলো, হ্যাঁ, পৃথিবীর শুরুর ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সেই বৃষ্টি ঠিক কত দিন একটানা ঝরেছিল, তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বিজ্ঞান জানে না।কারণ সহজ। তখন তো মানুষ ছিল না, আবহাওয়া অফিসও ছিল না। পৃথিবীর সেই সময়ের কোনো সরাসরি রেকর্ড নেই। বিজ্ঞানীরা প্রাচীন খনিজ, উল্কাপিণ্ড, চাঁদের গর্ত এবং কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণ করে সেই সময়ের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা করেন।অনেক জনপ্রিয় লেখা বা সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়, “২০ লাখ বছর একটানা বৃষ্টি হয়েছিল।” কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। নাসাসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় কোথাও এমন নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা হয় না।বরং বলা হয়, পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলীয় বাষ্প বারবার ঘনীভূত হয়েছে, বৃষ্টি হয়েছে, আবার বাষ্পে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলেই ধীরে ধীরে পৃথিবীর প্রথম মহাসাগর তৈরি হয়।মহাসাগরের জন্ম ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। কারণ তরল পানি ছাড়া প্রাণের উদ্ভব কল্পনা করা কঠিন। আজ পৃথিবীতে যত জীবনের অস্তিত্ব, তার পেছনে সেই প্রাচীন বৃষ্টির অবদান অনস্বীকার্য।ভাবুন তো, আজ আমরা টানা তিন দিন বা সাত দিনের বৃষ্টিতে বিরক্ত হই। অথচ একসময় বৃষ্টিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। সেই বৃষ্টি না হলে হয়তো এই গ্রহে সমুদ্র থাকত না, নদী থাকত না, গাছ জন্মাত না, মানুষও থাকত না।মজার বিষয় হলো, একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন পৃথিবীর প্রথম ৫০ কোটি বছর ছিল পুরোপুরি আগুনের নরক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন জিরকন খনিজ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন প্রমাণ পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয়–পৃথিবীতে জন্মের মাত্র প্রায় ২০ কোটি বছরের মধ্যেই তরল পানির অস্তিত্ব থাকতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবী হয়তো ধারণার চেয়ে অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।অবশ্য এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে। পৃথিবী তখন বারবার বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে কেঁপে উঠত। কোনো কোনো আঘাত এত শক্তিশালী ছিল যে আগে তৈরি হওয়া সমুদ্রও আবার বাষ্প হয়ে যেতে পারত। তারপর পৃথিবী আবার ঠান্ডা হয়েছে, আবার মেঘ তৈরি হয়েছে, আবার বৃষ্টি নেমেছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টি কোনো এক দিনের ঘটনা ছিল না; এটা ছিল কোটি বছরের এক পরিবর্তনের অংশ।আজ আমরা টানা তিন দিন বা সাত দিনের বৃষ্টিতে অতিষ্ঠ হই। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে বৃষ্টি একসময় ছিল সৃষ্টির ভাষা। সেই বৃষ্টি না হলে হয়তো মহাসাগর তৈরি হতো না, আর মহাসাগর না থাকলে পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাসও হয়তো অন্যরকম হতো।তাই ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ বৃষ্টি কত দিন হয়েছিল?’–এই প্রশ্নের উত্তর কোনো সংখ্যা নয়। উত্তরটি লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার ইতিহাসে। আগুনের এক গ্রহ কোটি কোটি বছরের অভিযাত্রায় পরিণত হয়েছে নীল গ্রহে। আর সেই রূপান্তরের নীরব সাক্ষী ছিল বৃষ্টি।হয়তো পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টি কোনো মানুষের চোখে ধরা পড়েনি। কিন্তু সেই অদেখা বর্ষণের ফোঁটাগুলোই একদিন মহাসাগরে রূপ নিয়েছে। সেই মহাসাগরের তীরেই, বহু কোটি বছর পরে, দাঁড়িয়ে মানুষ আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে একই প্রশ্ন করে–আর কতক্ষণ বৃষ্টি হবে? সূত্র: নাসা
রাজনীতি
টানা বৃষ্টিতেই ৭ মহাসাগর সৃষ্টি! কবে, কীভাবে

শেয়ার করুন







