কোরবানির ঈদের পর পর্যটনে বাগড়া বসিয়েছে বৃষ্টি। তবুও এসময়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কম-বেশি পর্যটক সাগর-প্রকৃতির সান্নিধ্য নিতে কক্সবাজার এসেছেন। কিন্তু ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ দ্বিবর্ষের ছুটির একদিন পর সাপ্তাহিক মিলিয়ে টানা বন্ধকে কাজে লাগাচ্ছে ভ্রমণপিপাসুরা। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ছুটি নিয়ে টানা চারদিন দরিয়াপাড়ে ঘুরতে আসছেন অসংখ্য পর্যটক। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত পর্যটন জোনের তারকা হোটেল-মোটেলসহ আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কক্ষ আগাম বুকিং দিয়েছেন ভ্রমণকারীরা। এতে আগামী তিনদিন কক্সবাজারে পর্যটন জমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ৫ আগস্ট সরকারি বন্ধ। এবার দ্বিতীয় বর্ষ হিসেবে বন্ধের দিনটি পড়েছে বুধবার। বৃহস্পতিবার খোলার দিনটি সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীরা ছুটি নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটিতে যুক্ত করে চারদিনের ছুটি মিলিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে আসছেন। চলতি বছরের ঈদুল আজহায় ১০ দিন এবং ঈদুল ফিতরে ছুটি মিলেছিল ১১ দিনের। সে সময়ের মতো সামনের চারদিন ভালো বাণিজ্য হওয়ার আশা করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেড’র বিপণন ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নুর সোমেল বলেন, আষাঢ়ি বর্ষণে কক্সবাজারে নাজুক পরিস্থিতি গেছে। কিন্তু শ্রাবণে এসে মেঘ-রোদ-বৃষ্টির লোকচুরি চলছে। এসময়টাতে সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন কমবেশি পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। কিন্তু টানা বন্ধ নিয়ে বেশি পর্যটক কক্সবাজার আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ৫-৬-৭ আগস্ট। এ তিনটা দিন পর্যটন জোনের সকল তারকা হোটেলের রুম আগাম বুকিং হয়ে আছে। ননতারকা হোটেলগুলোও কমবেশি বুকিং হয়েছে বলে খবর পেয়েছি।

কক্সবাজারের সনাতনধর্মীয় নেতা স্বপন গুহ বলেন, ৫ আগস্টের বন্ধের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে তিনদিনের সময় নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে আমার বেশ কিছু মেহমান আসছেন। বর্ষাকালে লোকজনের উপস্থিতি কম থাকে তাই আগাম বুকিং দিয়ে রাখিনি। কিন্তু আজ (৪ আগস্ট) হোটেল-মোটেল জোনে গিয়ে হতভম্ব হতে হয়েছে। বুধ-বৃহস্পতিবার কোনো হোটেলে রুম নেই। অতিথিদের নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়লেও এমন সময়ে পর্যটন জোনের আবাসিক প্রতিষ্ঠান পুরো বুকড হয়েছে দেখে কক্সবাজারের ব্যবসায়ী হিসেবে আনন্দই লেগেছে। ভ্রমণকারীরা যেন আন্তরিক সেবা পায় এবং বার বার তাদের কক্সবাজারের প্রতি আকৃষ্ট রাখার তাগাদা নিয়ে সবাই কাজ করবে সেটাই কাম্য।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুরস অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (টুয়াক) সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, সচেতন ভ্রমণপিয়াসীরা ভোগান্তি এড়িয়ে নিরাপদ অবকাশ যাপনে পছন্দের হোটেল-মোটেল-কটেজে আগাম বুকিং দেন- এবারো তেমনটি হচ্ছে। মেঘ-বৃষ্টি-রোদের খেলাতেই পর্যটন ব্যবসা চাঙা হওয়ার ইঙ্গিত পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সবার লক্ষ্য পর্যটকদের শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা।

এদিকে পর্যটকদের ভিড় সামলানো ও ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ঈদুল ফিতর ও আজহায় কক্সবাজার সৈকত ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১০-১২ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই জুলাই অভ্যুত্থান দিবসের বন্ধেও লাখো পর্যটকের ভিড় হবে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবারের মতো এবারো অতিথি বরণে হোটেল-মোটেল গোছানো এবং সবকিছুতেই বাড়তি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। জেলা সদরের বাইরে হিমছড়ি, দরিয়ানগর, ইনানী, মহেশখালী, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, রামুর স্বপ্নতরীসহ জেলার সব পর্যটন স্পটগুলোকে ইজারাদাররা গুছিয়ে নিচ্ছেন।

হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার বলেন, আমরা পর্যটক সেবায় সবসময় প্রস্তুত। সারাবছরই কক্সবাজার সরগরম থাকুক সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করি।

সী-সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী জয়নাল আবেদীন ভুট্টো বলেন, বর্ষার কারণে সমুদ্র বেশ উত্তাল। কোরবানির ছুটি থেকে টানা পর্যটক রয়েছে সৈকতে। ছুটির দিনে বেলাভূমির তিনটি প্রধান পয়েন্টে বিপুল পরিমাণ পর্যটক-দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। গোসলে নামেন কয়েক হাজার মানুষ। আমাদের সদস্যরা তিনটি পয়েন্টেই সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখেন। এরপরও অনেকে ভেসে যান, জানতে পারলেই তাদের উদ্ধার করা হয়। এ চারদিনও সতর্কভাবে দায়িত্বে থাকবো আমরা।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকি। বিপুল পরিমাণ পর্যটক উপস্থিতি হলেই মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। সৈকতে গোসলে নেমে কেউ যেন ঝুঁকি বা বিপদের মুখে না পড়েন- আমাদের উদ্ধারকর্মীদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। এরপরও অসাবধানতায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে।

মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, বুধ-বৃহস্পতিবার বুকিং ভালোই রয়েছে। পর্যটন মৌসুমের আবহ এসেছে বর্ষায়। তবে রিন্যুভেশনের কারণে সব রুম বিক্রয়ে আনতে পারছেন না আমাদের মতো অনেকে।

হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা রিয়াদ ইফতেখার বলেন, শহর ও আশপাশের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-গেস্ট হাউসে প্রায় দেড় লাখাধিক পর্যটক রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। এখন হোটেল কক্ষ ভাড়ায় ৩৫-৪০ শতাংশ ছাড়ে কক্ষ পাচ্ছেন পর্যটকরা।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আজমল হোসেন বলেন, বর্ষা হলেও সপ্তাহের সবদিনেই পর্যটক উপস্থিতি রয়েছে কক্সবাজারে। তবে শুক্র ও শনিবার বিপুলসংখ্যক পর্যটক-দর্শনার্থীর ভিড় জমে। বুধবারের বন্ধকে উপলক্ষ্য করে পর্যটন জোনের হোটেল-মোটেল বুকিং ভালোই হয়েছে বলে জেনেছি। অতীত অভিজ্ঞতায় টানা ছুটিতে সৈকতে বিপুল পর্যটক সমাগম ঘটবে আশা করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। আগতদের নিরাপত্তায় ‘কলাতলী-সুগন্ধা-লাবণী’ তিন পয়েন্ট এবং ইনানী, হিমছড়িতে দুই শিফটে ট্যুরিস্ট পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা আগের মতোই দায়িত্ব পালন করবে। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তরিকতায় দায়িত্ব পালন করছে।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, বর্ষার এ বন্ধ পূর্বের ধারণা পাল্টে কক্সবাজারে পর্যটক সমাগম বাড়বে আশা করা যায়। সবার ভ্রমণ আরামদায়ক করতে নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। হয়রানি ও ভোগান্তি নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে মাঠে থাকবে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এএসএম