যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান বৈরিতার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে নাকি কমবে, তা শুধু পারস্য উপসাগর থেকে কত তেল বিশ্ববাজারে যাচ্ছে, এর ওপর নির্ভর করছে না। এ ক্ষেত্রে চীনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন চলতি বছরের বসন্তে তেল কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এতে বৈশ্বিক চাহিদা এতটাই কমে যায় যে যুদ্ধের শুরুতে তেলের দাম যতটা বাড়তে পারত, ততটা বাড়েনি।
এখন বাজারের বড় প্রশ্ন হলো চীন আবার কবে থেকে তেল আমদানি বাড়াবে। দেশটি যত বেশি সময় তেল কম কিনবে, তেলের দাম তত বেশি সময় কম থাকবে। অন্যদিকে চীনের চাহিদা বাড়লে অন্য সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে তেলের দামও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্যারেন ইয়াং বলেন, চীনের চাহিদা কোন দিকে যাচ্ছে, সেটাই এখন বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বড় প্রভাব ফেলছে
তেলের বাজারে আরেকটি বড় প্রভাবক হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদেশে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় গত সপ্তাহে পাইকারি বাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা কমে গেছে।
সাধারণত দেখা যায়, পাইকারি বাজারে জ্বালানির দামের পরিবর্তনের প্রভাব কিছু সময় পর খুচরা বাজারেও পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল সংগঠন এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৪ দশমিক ৮৮ ডলার, এক সপ্তাহ আগের তুলনায় যা ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
তেল কেনা শুরু করবে চীন
চীনের তেল আমদানি আবার বাড়তে পারে, এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) সম্প্রতি বলেছে, চীনের নতুন করে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কিছু বিশেষ ট্যাংকারে তেল ভরা হয়েছে। এসব ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, চীনের আবার তেল কেনার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
চীন সরকারের মে মাসের শুল্ক তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় চীনের তেল আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টি এখনো রহস্যজনক। ধারণা করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত তেলের মজুত এখন চীনে। কিন্তু স্যাটেলাইটে পর্যবেক্ষণযোগ্য স্থলভিত্তিক মজুত থেকে দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ব্যবহার করছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, যুদ্ধ চলাকালে চীনের শোধনাগারগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় কম তেল পরিশোধন করেছে। যুদ্ধের শুরুতে দেশটি পরিশোধিত তেলপণ্য রপ্তানিও বন্ধ করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এসব কারণ দিয়ে আমদানিতে এত বড় পতনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
বিকল্প জ্বালানির সুবিধা
চীনের হাতে আরও কিছু বিকল্প আছে। দেশটিতে বিশাল কয়লার মজুত আছে, এই কয়লা ব্যবহার করে তেলজাত পণ্যের পরিবর্তে বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদন করা যায়। এ ছাড়া দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারও এখন চীন। সেই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কও চীনে। বিপুল পরিমাণ মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করেন। ফলে পরিবহন খাতে তেলের চাহিদাও তুলনামূলকভাবে কম।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের তেল সংকটের পর এবারই প্রথম চীনের তেল ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমতে পারে।
বড় মজুতের কারণে চাপ কম
চীনে তেলের যে বিপুল মজুত আছে, সে কারণে দেশটি দীর্ঘ সময় আমদানি না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে, বিশ্লেষকেরা এমনটাই মনে করছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো বেন কাহিল বলেন, চীনের ওপর এখনই আমদানি বাড়ানোর চাপ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী তেল আমদানি বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে চীনের যে সক্ষমতা, সেটাই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি।
কেননা, চীন নিজেই তার চাহিদার অধিকাংশ তেল আমদানি করে। অতীতে সাধারণত উৎপাদক দেশগুলোর হাতেই বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল। বিশেষ করে অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস (ওপেক) বহুবার উৎপাদন সমন্বয়ের মাধ্যমে তেলের দাম বাড়িয়েছে বা কমিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি এবং চলতি বসন্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জোট ছাড়ার পর ওপেকের প্রভাব কিছুটা কমেছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, বর্তমানে তেলের বাজারে চীনের প্রভাব পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি, এমনকি সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
এদিকে পারস্য উপসাগরের সংঘাত কতটা তীব্র হয় এবং তা জাহাজমালিকদের জন্য কতটা আতঙ্কের, সেটাও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করছে। দেশটির তেলের বড় অংশ যেন বিশ্ববাজারে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যে আবার এই অবরোধ।
ট্রাম্প আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক’। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রণালি দিয়ে যাওয়া সব কার্গো থেকে নিরাপত্তা বাবদ ২০ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র, তবে আন্তর্জাতিক আইনের অধীন এমন অর্থ আদায়ের বৈধ ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মে মাসের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওমান উপকূলঘেঁষা নিরাপদ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ নাগাদ এই ব্যবস্থার আওতায় শত শত মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক জ্যেষ্ঠ জ্বালানি উপদেষ্টা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, এখন পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, ভবিষ্যতেও তা কার্যকর থাকতে পারে, তবে এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটাই বড় প্রশ্ন।








