রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে চলতি জুলাই মাসে ছয়জনকে গ্রেপ্তার, সিঙ্গাপুরে আটক দুজনকে দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পরও বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত নিষিদ্ধঘোষিত নয়টি জঙ্গি সংগঠনের ৩৭০ সদস্য এবং কারাগার থেকে পালানো ৯ জঙ্গির হদিস না থাকায় তাঁদের একাংশের আবার পুরোনো তৎপরতায় সক্রিয় হওয়ার একটি আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ছিল। কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সিঙ্গাপুরের ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই জোরালো করেছে। এই শঙ্কা বাড়ছে ৩৭৯ জঙ্গি পলাতক থাকায়।

একাধিক সূত্র বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার, ছোট ছোট প্রশিক্ষণদানকারী চক্র গড়ে তোলা এবং অনলাইনে নতুন সদস্য আকৃষ্ট করার চেষ্টার বিষয়ে তথ্য যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন।

পুলিশ বলেছে, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাটিকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মানুষের উদ্বেগের কিছু নেই। দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। জেল পলাতক ও জামিনে মুক্তির পর লাপাত্তা জঙ্গিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যাত্রাবাড়ী থেকে ৫ জুলাই উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণের অভিযোগে পুলিশের গ্রেপ্তার করা ছয়জনের মধ্যে দুজন রিমান্ডে রয়েছেন। বাকি চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সিঙ্গাপুর থেকে আটক দুজনকে গত বুধবার দেশে ফেরত পাঠানোর পর গতকাল বৃহস্পতিবার ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ীর একটি বালুর মাঠ থেকে গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে একজন হলেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস) নামের একটি সংগঠনের প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির। মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশের গ্রেপ্তার করা এই ছয়জনের বাকি পাঁচজন হলেন হোসাইন তানিম, মো. জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, মো. আবিদুর রহমান ও মো. বায়েজিত। ৫৪ ধারায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিন করে রিমান্ডে নেয় থানার পুলিশ। ওই রিমান্ড শেষে চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সাবির ও তানিমকে বুধবার আবার তিন দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে ওই থানার পুলিশ। তবে তাঁদের মূল জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।

সিটিটিসির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কারাগারে পাঠানো চারজনের উগ্রবাদে জড়ানোর বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সাবির ও তানিমের বিরুদ্ধে উগ্রবাদে জড়িত হওয়ার কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত সাবির বা অন্যদের সঙ্গে দেশি কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাবির উগ্রবাদে উদ্দীপ্ত হয়ে শারীরিক কসরত ও বিস্ফোরণের দৃশ্য তাঁদের ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে ছড়িয়েছেন বলে পুলিশকে বলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিস্ফোরণের ওই ভিডিওটির বিষয়ে সিটিটিসি বলেছে, সেটি আইইডি ছিল না, পটকার উপকরণ দিয়ে তৈরি। ‘ম্যাক ইউরি’ নামে এক ব্যক্তির পরিচয় ও সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি কোনো উগ্রবাদী ব্যক্তির ছদ্মনাম হতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। আরও যাচাই-বাছাই করে দেখছি। তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কিছু নেই। উগ্রবাদ দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না।’

জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সিঙ্গাপুর পুলিশের হাতে আটক দুই বাংলাদেশি সাহেদুল ইসলাম ও রিশাদ তায়ানীকে বুধবার দেশে ফেরত পাঠানো হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশ তাঁদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে। গতকাল তাঁদের আদালতে হাজির করে তিন দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। সিটিটিসি এ বিষয়টিও তদন্ত করছে।

পুলিশ বলেছে, সিঙ্গাপুরে বসে এ দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উগ্রবাদী মতামত ছড়াতেন এবং উগ্রবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে সিঙ্গাপুর পুলিশ তথ্য পেয়ে আটক করে। তাঁদের সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থায়ন ও বাংলাদেশে কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিটিটিসির প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত ছিলেন। লেখালেখি করতেন। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। ওই মাদ্রাসার পরিচালক ও মূল অভিযুক্ত আল আমিন শেখ ও তাঁর সহযোগী শাহিনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মামলা ছিল। পুলিশের সূত্র বলেছে, তাঁরা আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে পুনরায় গোপনে নিষিদ্ধ সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (জেএমজেবি) কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।

ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। ওই মামলায় চার নারীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে চার নারী বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

প্রধান আসামি আল আমিন শেখকে গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিন পেয়েছিলেন। হাসনাবাদের ওই মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে তাঁর স্ত্রী আছিয়া বেগম ও সন্তান আহত হয়। ঘটনার পর তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন।

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও এটিইউর পরিদর্শক শাহিদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, আল আমিন শেখ গ্রেপ্তারের পর বোমা তৈরির বিষয়ে স্বীকার করেছেন।

এটিউই সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে লাপাত্তা হওয়া ৩৭০ জনের মধ্যে অনেকে অপরাধে জড়িয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জামিনে মুক্তির পর লাপাত্তা হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সদস্য নিষিদ্ধ জেএমবির, ১৮৫ জন। এরপর রয়েছে হিযবুত তাহ্‌রীরের ৫৯ জন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) ৫৮ জন, আনসার আল ইসলামের ২৫ জন, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, ‘আল্লাহর দল’-এর ৯ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার একজন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য লাপাত্তা রয়েছেন। তাঁরা জামিনের পর আর আদালতে হাজিরা দেননি।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই ৩৭০ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৬৩ জন, ঢাকা বিভাগের ৮৬, রংপুর বিভাগের ৫২, খুলনা বিভাগের ৩২, রাজশাহী বিভাগের ২৪, সিলেট বিভাগের ৭ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৬ জন পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত নয়জন পালিয়ে যান। তাঁদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সূত্র বলছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের এসব সদস্য পলাতক থাকায় অনলাইন ও অফলাইনে উগ্রবাদ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই এদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তাদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আদালতে হাজির না হওয়া এসব আসামির অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বা জারির প্রক্রিয়া চলছে। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম, অনলাইন যোগাযোগ, অর্থের উৎস এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলেছে, জেল পলাতক ৯ জন এবং জামিনে মুক্তির পর পলাতক ৩৭০ জনের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা যেসব মামলার আসামি, সেসব মামলার অগ্রগতি এবং আদালতে অনুপস্থিতির বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের বিচারাধীন বা তদন্তাধীন সদস্যদের দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ, তারা আত্মগোপনে থেকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ৫ আগস্টের পর উগ্রবাদ নিয়ে একধরনের শিথিলতার কারণে এরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই পুলিশের বর্তমান তৎপরতা ভালো।

সিটিটিসির প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, যারা পলাতক রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখনই এ বিষয়ে বলা যাবে না। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।