দেশের কিংবদন্তিতুল্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতাঙ্গনে অবদান রেখেছেন। এ জন্য তিনি অর্জন করেছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা। আজ (১ জুলাই) এই শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৪০ সালের আজকের দিনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

সৈয়দ আব্দুল হাদী সংগীত জীবনে সফলতা পেয়েছেন কিন্তু জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় তাকে একটি আক্ষেপ আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। আর সেটি হলো-বাবার একটি ইচ্ছা পূরণ করতে না পারা।

সৈয়দ আব্দুল হাদী এক সাক্ষাৎকারে জানান, তার শৈশব কেটেছে আগরতলায় নানির কাছে। পরে বাবার চাকরির কারণে চলে আসেন সিলেটে। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর ও ঢাকায় পড়াশোনা করেন। বাবার চাকরি ছিল তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (ইপিসিএস)। বদলির চাকরির কারণে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতে হতো পরিবারকে।

যে ভুলের জন্য আজও আক্ষেপ করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী

শিল্পীর ভাষ্য, তখনকার সময়ে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও দূরত্ব-দুটোই ছিল। তিনি বলেন, ‘বাবার সামনে কখনো চোখ তুলে কথা বলার সাহস হতো না। তখনকার প্রায় সব পরিবারেই এমন পরিবেশ ছিল।’

আলাপচারিতায় বাবাকে ঘিরে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কথাও জানান তিনি। স্মৃতিচারণ করে বলেন, একবার পটুয়াখালীতে কর্মরত অবস্থায় বাবা তাকে সেখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। অন্য অনেক শিল্পী গেলেও তিনি আর যাননি।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, ‘এখনো বিষয়টা মনে হলে খুব খারাপ লাগে। নিজেকেই শাস্তি দিতে ইচ্ছা করে। বাবার এতটুকু অনুরোধও রাখতে পারিনি।’

যে ভুলের জন্য আজও আক্ষেপ করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী

তিনি আরও বলেন, ‘পরে বাবা চাইতেন আমি যেন তার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি, গল্প করি। কিন্তু তখন আমি বরং ভাবতাম, কীভাবে দ্রুত উঠে আসা যায়।’

আরও পড়ুন

এরশাদের নির্দেশও মানেননি মুস্তাফা মনোয়ার, তারপর যা ঘটেছিল…

সংগীতজীবনের শুরুর দিকের কথাও বলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। জানান, কোনো ওস্তাদের কাছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে গান শেখার সুযোগ তার হয়নি। একসময় সেতার শেখার চেষ্টা করলেও আঙুলে ফোসকা পড়ে যাওয়ায় ওস্তাদ তাকে বলেছিলেন, ‘এটা তোমার কাজ নয়, তুমি বরং গান করো।’ সেই পরামর্শই যেন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও বাবা চেয়েছিলেন ছেলে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিক, কিন্তু তিনি বেছে নেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের পথ। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও তার কোনো আক্ষেপ নেই।

দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ আব্দুল হাদীর উপলব্ধি, মানুষের জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি কিছু অপূর্ণতাও থেকে যায়। আর বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটাতে না পারা সময়ের সেই আক্ষেপই আজও তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

যে ভুলের জন্য আজও আক্ষেপ করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী

সৈয়দ আব্দুল হাদী দেশাত্ববোধক গানের জন্যও তুমুল জনপ্রিয়। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সংগীত করছেন। ১৯৬০ সালে ছাত্রজীবন থেকেই চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে সৈয়দ আব্দুল হাদী একক কণ্ঠে প্রথম বাংলা সিনেমায় গান করেন। সিনেমার নাম ছিল ‘ডাকবাবু’। মো. মনিরুজ্জামানের রচনায় সংগীত পরিচালক আলী হোসেনের সুরে একটি গানের মাধ্যমে সৈয়দ আব্দুল হাদীর চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু।

সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় কিছু গান হলো, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার, একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, এই পৃথিবীর পান্থশালায়, চলে যায় যদি কেউ বাঁধন ছিঁড়ে, এমনও তো প্রেম হয়, কারও আপন হইতে পারলি না, কেউ কোন দিন আমারে তো, যেও না সাথী, শূন্য হাতে আজ এসেছি, দুঃখ চির সাথীরে, সখি চলনা জলসা ঘরে যাই, আমি তোমার ই প্রেম ভিক্ষারী, চক্ষের নজর এমনি কইরা, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, চোখ বুঝিলে দুনিয়া আন্ধার, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি, যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে, কথা বলবো না বলেছি ইত্যাদি।

আরও পড়ুন

নতুন সিনেমার সাফল্য নিয়ে যা বললেন জয়া আহসান

সৈয়দ আব্দুল হাদী পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালে সংগীতে অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

এমএমএফ/এএসএম