কুমিল্লার ধর্মসাগরপাড়ের নগর উদ্যানটি মানুষের প্রশান্তির জায়গা। ২০২১ সালে নগর উদ্যানের ভেতরে নির্মাণ করা হয় একাত্তরের স্মৃতিবহুল ‘যুদ্ধাহত বীর’ ভাস্কর্য। কিন্তু প্রাঙ্গণ দীর্ঘদিন ধরে অপরিচ্ছন্ন ছিল। আগাছায় ভরে ছিল আঙিনা। ময়লা জমেছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যটিতেও। এবার সেই প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করে ফুলের বাগান গড়ে তুলেছেন কুমিল্লা বন্ধুসভার বন্ধুরা। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘যুদ্ধাহত বীর প্রাঙ্গণে ফুলের হাসি’।
প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বন্ধুসভার ‘একটি ভালো কাজ’–এর অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষে শনিবার বিকেলে প্রাঙ্গণটি ফুলের বাগানে রূপ পায়। সেখানে রঙ্গন, চায়না টগর, গোলাপ, তিন ধরনের গাঁদা, পাতাবাহার, কসমস, ডালিয়াসহ বিভিন্ন ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছে। ভাস্কর্য, দেয়াল, টাইলস ও বাংলাদেশের মানচিত্রের অংশও পরিষ্কার করেন বন্ধুরা।
২৫ অক্টোবর দুপুরে ভাস্কর্য প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে বন্ধুসভার এ উদ্যোগের উদ্বোধন করেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু)। নগর উদ্যানের মালিকানা ও দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউসুফ মোল্লা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বন্ধুসভার এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বন্ধুসভার সদস্যদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বন্ধুসভা যেভাবে ভালো কাজ করার চেষ্টা করে, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে তাঁর প্রতিদিন আরও বেশি ভালো কাজ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ইউসুফ মোল্লা আরও বলেন, কুমিল্লাকে পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য, আধুনিক ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ধর্ম-বর্ণ ও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে নগরীর উন্নয়নে সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার কথাও জানান। এ সময় পুরো নগর উদ্যানকে আধুনিক করে সাজাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কুমিল্লা বন্ধুসভার উপদেষ্টা শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বন্ধুসভা গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা বেছে নিয়েছে। প্রথম আলো ও বন্ধুসভা সব সময় ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আশা করি।’ এ উদ্যোগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির সৌন্দর্য বাড়বে বলেও তিনি মনে করেন।

কুমিল্লা বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও নারীনেত্রী দিলনাশি মোহসেন বলেন, ‘নগর উদ্যানের এই অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। বন্ধুসভার সদস্যরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জায়গাটিকে নতুন করে সাজিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণ করা এই প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য ধরে রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। এ জন্য সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বন্ধুসভার সদস্যদেরও উদ্যোগটির দেখভাল অব্যাহত রাখতে হবে।’
ইতিহাস–গবেষক ও বন্ধুসভার উপদেষ্টা আহসানুল কবীর বলেন, ‘যা কিছু ভালো, তার সাথে প্রথম আলো’—এই প্রত্যয় ধারণ করে বন্ধুসভা আরও একটি ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধাহত বীর ভাস্কর্য প্রাঙ্গণকে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক ফুলের বাগান করে তোলার এ উদ্যোগে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের অংশগ্রহণও আশাব্যঞ্জক। সম্মিলিত উদ্যোগে কুমিল্লা একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।
বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন বলেন, ‘বন্ধুসভার সদস্যরা প্রতিবছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি ভালো কাজ করেন। এবারের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান, প্রথম আলো কুমিল্লা কার্যালয়ের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা (জুয়েল), কুমিল্লা বন্ধুসভার সভাপতি প্রশান্ত কর্মকার, সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোসাব্বির, প্রশিক্ষণ সম্পাদক শাহরিয়ার ইসলাম, বন্ধু মফিজুল ইসলাম, ফাতেমা আক্তার, মুশফিকা মুনা, খাদিজা ইয়াসমিন, সাইমুন ইসলাম, জুনায়েদ আল মাহমুদ, হাসিবুজ্জামান জেমস্, মারিয়া আক্তার, নুসরাত জাহান, রাইসা জাহানসহ বন্ধুসভার বন্ধুরা।
২০২১ সালে ভাস্কর্যশিল্পী মোহাম্মদ শাহীন ‘যুদ্ধাহত বীর’ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। ভাস্কর্যটিতে ক্রাচে ভর দিয়ে বিজয়ের উল্লাসে দাঁড়িয়ে থাকা এক মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর এক হাতে উঁচু করে ধরা রাইফেল, যার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ভাস্কর্যটির পেছনের ফলকে বাংলাদেশের মানচিত্রসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের বিভিন্ন প্রতীক স্থান পেয়েছে।
সভাপতি, কুমিল্লা বন্ধুসভা








