চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতিতে সাবমেরিন বহরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, পরিকল্পনায় থাকা ১৯টি পরমাণু চালিত ভার্জিনিয়া-শ্রেণির অ্যাটাক সাবমেরিনকে গাইডেড-মিসাইল সাবমেরিনে (SSGN) রূপান্তর করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে ওয়াশিংটনের যুদ্ধ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

১৫ বছর ধরে আধুনিকায়ন / চীন-মার্কিন উত্তেজনা: প্রশান্ত মহাসাগরে হামলায় সক্ষম ‘জুমওয়াল্ট’

জানা গেছে, নতুন সাবমেরিনগুলোতে ভার্জিনিয়া পেলোড মডিউল (VPM) যুক্ত করা হবে। প্রায় ৮৪ ফুট দীর্ঘ এই অতিরিক্ত অংশের মাধ্যমে প্রতিটি সাবমেরিনে ২৮টি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সেল যুক্ত হবে। বর্তমানে ভার্জিনিয়া শ্রেণির সাবমেরিনে থাকা ১২টি সেলের সঙ্গে এগুলো যুক্ত হয়ে মোট ৪০টি সেল হবে।

আরও পড়ুন

নীতি বদলাচ্ছে পেন্টাগন / চীন-রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র: ৮১ বছর পর আবারও পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কা!

 

এসব সেলে টমাহক ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি হাইপারসনিক অস্ত্রও বহন করা যাবে। সাবমেরিনের গোপনীয়ভাবে চলাচলের সক্ষমতার সঙ্গে এই বাড়তি ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে চীনের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে কাছাকাছি অবস্থান থেকে হামলার সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন

চীনা পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, উদ্বিগ্ন জাপান

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, সাবমেরিন এমন কয়েকটি সামরিক সক্ষমতার মধ্যে একটি যা তুলনামূলক নিরাপদে প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের কাছাকাছি বা এর ভেতরে অবস্থান করতে পারে। জাপান থেকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বীপ ও এর আশেপাশের জলসীমার ভেতরেই চীন তার সবচেয়ে বেশি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে।

সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ওহাইও-শ্রেণির সাবমেরিন

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনাটি সামনে আসার মধ্যেই আরেকটি তথ্য পাওয়া গেছে। অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিতব করে বন্দরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে চারটি ওহাইও-শ্রেণির গাইডেড-মিসাইল সাবমেরিন । প্রায় দুই দশক আগে পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন থেকে এগুলোকে SSGN-এ রূপান্তর করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

দ্য ডিপ্লোম্যাট / চীনা সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সমুদ্রে পারমাণবিক লড়াই?

প্রতিটি ওহাইও-শ্রেণির SSGN সর্বোচ্চ ১৫৪টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও প্রতিরোধে এগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ হামলার সময়ও একটি ওহাইও-শ্রেণির সাবমেরিনকে বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে, চারটি সাবমেরিনের মধ্যে ইউএসএস জর্জিয়া গত মাসে নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। বাকি তিনটিও আগামী কয়েক বছরে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সাবমেরিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস কাউন্সিলের হিসাবে, এসব সাবমেরিন অবসরে গেলে মার্কিন নৌবাহিনীর পানির নিচ থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

নতুন ভার্জিনিয়া-শ্রেণির SSGN-এর প্রথমটি ২০২৯ সালের আগে বহরে যুক্ত হওয়ার কথা নয়। আর ১৯টির সর্বশেষটি যুক্ত হবে ২০৩৮ সালে। ফলে এর মধ্যবর্তী সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতায় সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, ওহাইও থেকে ভার্জিনিয়া-শ্রেণিতে রূপান্তরটি একে অপরের সরাসরি বিকল্প নয়। একটি নতুন ভার্জিনিয়া-শ্রেণির সাবমেরিনে একটি ওহাইও-শ্রেণির সাবমেরিনের মাত্র প্রায় ২৬ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যাবে। অর্থাৎ বর্তমানে একটি ওহাইও যে পরিমাণ ফায়ারপাওয়ার বহন করে, তা সমান করতে ভবিষ্যতে প্রায় চারটি ভার্জিনিয়া-শ্রেণির SSGN প্রয়োজন হবে।

আরেকটি পার্থক্য হলো, ওহাইও-শ্রেণিতে দুটি ক্রু ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে ভার্জিনিয়া-শ্রেণিতে একটি ক্রু থাকে। ফলে, ওহাইও-শ্রেণির সাবমেরিন তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় টহলে থাকতে পারে।

তবে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বেশি সংখ্যক সাবমেরিনে ছড়িয়ে দেওয়ারও সুবিধা রয়েছে বলে মনে করেন কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আলেসিও পাতালানো। তার মতে, এতে শত্রুর ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালাতে সক্ষম প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা বাড়বে। ফলে প্রতিপক্ষকে আরও বেশি সামরিক সম্পদ শনাক্ত ও অনুসরণ করতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন দ্রুত সাবমেরিন নির্মাণ করছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (IISS) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন ১০টি সাবমেরিন তৈরি করেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে মাত্র সাতটি। টনের হিসাবেও চীন এগিয়ে রয়েছে। চীনের ৭৯ হাজার টনের সাবমেরিনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে ৫৫ হাজার ৫০০ টন।

পাশাপাশি চীন দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিও বাড়াচ্ছে। পেন্টাগনের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এর আগের চার বছরে চীনের রকেট ফোর্স তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য তাইওয়ান যুদ্ধে চীন প্রথমে বন্দর, হেলিকপ্টার ঘাঁটি, সরবরাহ ঘাঁটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর হস্তক্ষেপ কঠিন করে তুলতে চাইতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

কেএম