ব্রাইডাল ফ্যাশনের ভাষা বদলাচ্ছে। লাল বেনারসি, ভারী গয়না কিংবা চিরাচরিত কনের সাজের পাশাপাশি এখন জায়গা করে নিচ্ছে ভাস্কর্যের মতো সিলুয়েট, ফুলের অনুপ্রেরণায় তৈরি ত্রিমাত্রিক নকশা এবং ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা সাহসী স্টাইলিং। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠলেন বলিউড অভিনেত্রী অনন্যা পান্ডে।

মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড সেন্টারে ডিজাইনার গৌরব গুপ্তার নতুন কতুর কালেকশন ‘লাইট সং-এর গ্র্যান্ড ফিনালেতে শোস্টপার হিসেবে র‍্যাম্পে ওঠেন তিনি। আলো, সংগীত আর নাটকীয় উপস্থাপনার মাঝখানে অনন্যার আইভরি ব্রাইডাল লুক যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছিল।

jago1

তবে এই উপস্থিতি শুধুই প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনন্যার অ্যাভান্ট-গার্ড স্টাইলিং, বিশেষ করে সেপ্টাম রিং এবং ঠোঁটের মেকআপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ একে সাহসী ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বলেছেন, আবার কেউ মনে করেছেন এটি প্রচলিত ব্রাইডাল সৌন্দর্যের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই নয়।

jago

ফুলের পাপড়িতে লেখা এক ব্রাইডাল কবিতা

অনন্যার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ‘হোয়াইট ক্যামেলিয়া’ ব্রাইডাল লেহেঙ্গা। সদ্য ফোটা সাদা ক্যামেলিয়া ফুলের কোমল সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে তৈরি এই পোশাক গৌরব গুপ্তার সিগনেচার ভাস্কর্যধর্মী নকশার সঙ্গে হাউট কতুর কারুশিল্পকে এক সুতায় বেঁধেছে।

লেহেঙ্গার ভলিউমিনাস আইভরি স্কার্টজুড়ে বসানো হয়েছে ২,৬০০টিরও বেশি হাতে কাটা ত্রিমাত্রিক ক্যামেলিয়া পাপড়ি। প্রতিটি পাপড়ি আলাদা করে তৈরি করে স্তরে স্তরে বসানো হয়েছে, যেন সত্যিকারের ফুলের টেক্সচার ফুটে ওঠে। পুরো পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছে ১২ হাজার মুক্তা এবং ৬৮০টিরও বেশি ক্রিস্টাল। একটি লেহেঙ্গা সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ৪৯০ ঘণ্টা।

jago

র‍্যাম্পের আলোয় মুক্তা আর ক্রিস্টালের প্রতিফলন এমন অনুভূতি তৈরি করছিল, যেন শিশিরে ভেজা সাদা ফুলগুলো বাতাসে দুলছে।

যেখানে কনের ব্লাউজও হয়ে ওঠে ভাস্কর্য

এই লুকের সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রচলিত ব্রাইডাল ব্লাউজের বদলে পরা স্কাল্পটেড সুইটহার্ট-নেক ব্রালেট। মুক্তা ও ক্রিস্টালের সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি এই ব্রালেটের কাঁধ থেকে ঝরে পড়েছে স্ফটিক অলংকরণ, যা পুরো লুককে দিয়েছে প্রায় অলৌকিক এক আবহ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ-লাইন লেহেঙ্গা, লম্বা ট্রেন এবং ফ্লোর-সুইপিং ভেইল। ফলে পুরো সিলুয়েটটি ছিল একই সঙ্গে রাজকীয়, নাটকীয় এবং সমসাময়িক।

কোমরে ব্যবহৃত ইনফিনিটি মোটিফ ছিল ডিজাইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি নতুন শুরু, রূপান্তর এবং অসীম সম্ভাবনার প্রতীক। যা আধুনিক কনের নতুন যাত্রাকেই যেন প্রতিনিধিত্ব করে।

jago

কম গয়নায় বেশি প্রভাব

ভারী নেকলেস বা ঐতিহ্যবাহী অলংকারের বদলে অনন্যার লুকে গুরুত্ব পেয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী স্টেটমেন্ট পিস।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ১০০ ক্যারেটেরও বেশি হীরা বসানো ডায়মন্ড হেডপিস। এর সঙ্গে ছিল ডায়মন্ড সেপ্টাম রিং, যা প্রচলিত নথের আধুনিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। হীরার আংটি এবং সংযত অলংকার পুরো লুককে বিলাসবহুল করলেও কোথাও অতিরিক্ত মনে হয়নি।

jago

সফট গ্ল্যামের নতুন সংজ্ঞা

বিউটি লুকেও ছিল আধুনিকতার ছাপ। মাঝখানে সিঁথি করা হাফ-আপ হেয়ারস্টাইল, রুপালি শিমার আইশ্যাডো, হালকা গোলাপি ব্লাশ, গ্লসি পিংক ঠোঁট এবং কলারবোনে সূক্ষ্ম বডি গ্লিটার-সব মিলিয়ে এটি ছিল এমন এক সফট গ্ল্যাম, যেখানে মেকআপ পোশাককে ছাপিয়ে যায়নি, বরং পরিপূর্ণ করেছে।

র‍্যাম্পের বাইরে আলোচনার কেন্দ্রেও

অনন্যার এই উপস্থিতি শুধুই ফ্যাশনের জন্য নয়, একটি ভাইরাল মুহূর্তের কারণেও আলোচনায় আসে। শো চলাকালে ডিজাইনার গৌরব গুপ্তাকে এক মুহূর্তের জন্য অনন্যার কোমরের দিকে হাত বাড়াতে দেখা যায়। অভিনেত্রী স্বাভাবিকভাবেই সামান্য সরে যান এবং অনুষ্ঠান এগিয়ে চলে।

jago

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় আলোচনা। কেউ একে স্বাভাবিক র‍্যাম্প মুহূর্ত বলেছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে অনন্যার সেপ্টাম রিং এবং ঠোঁটের মেকআপ নিয়েও নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

অনন্যা পান্ডের এই লুক শুধু একটি ব্রাইডাল পোশাক নয়; এটি বর্তমান ব্রাইডাল ফ্যাশনের পরিবর্তিত দর্শনের প্রতিচ্ছবি। এখানে ঐতিহ্যের জায়গা নিয়েছে না, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাস্কর্যধর্মী নকশা, কারুশিল্প, সাহসী স্টাইলিং এবং ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।

ফ্যাশন বদলায়, ট্রেন্ড আসে-যায়। কিন্তু এমন কিছু লুক থাকে, যা শুধু একটি র‍্যাম্প শো নয়, একটি সময়ের নান্দনিকতাকেই সংজ্ঞায়িত করে। অনন্যা পান্ডের হোয়াইট ক্যামেলিয়া নিঃসন্দেহে সেই তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার মতোই একটি সৃষ্টি।

সূত্র: টাইম অব ইন্ডিয়া, দ্য সানডে গার্ডিয়ান

এসএকেওয়াই