দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে আগামী দেড় বছরের মধ্যে বহরে যুক্ত হবে ২১টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে সংস্থাটির বহর প্রায় দ্বিগুণ হবে। আন্তর্জাতিক রুটেও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ ঘটবে প্রতিষ্ঠানটির।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহে মোট ১১১ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি বিমান লিজিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ সংগ্রহ করবে ইউএস-বাংলা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনাও প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, এটি ইউএস-বাংলার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ।
নতুন পরিকল্পনার আওতায় শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম ও সিলেটকেও আন্তর্জাতিক ট্রানজিট বা আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্ভাব্য নতুন গন্তব্যের তালিকায় রয়েছে সৌদি আরবের দাম্মাম, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পেনাং ও জোহর বাহরু এবং ব্রুনাই। পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রুটগুলোতেও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো হবে।
আগামী ২৯ জুলাই রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগিহ, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, আন্তর্জাতিক বিমান লিজিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি এভিয়েশন ও পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন।
ইউএস-বাংলার এমডি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক রুটে কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকেও সরাসরি বিদেশগামী ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে যেসব আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিদেশি এয়ারলাইনস বেশি যাত্রী পরিবহন করছে, সেখানে দেশীয় বিমান সংস্থার উপস্থিতি বাড়ানো প্রয়োজন। ইউএস-বাংলা সেই লক্ষ্যেই বহর সম্প্রসারণ করছে।”
নতুন উড়োজাহাজগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের কেবিন সুবিধা থাকবে। যাত্রীরা ওয়্যারলেস ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে নিজেদের মোবাইল, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপে সিনেমা, নাটক, সংগীতসহ বিভিন্ন বিনোদন উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই সুবিধাও থাকবে, যা বর্তমানে বিশ্বের অনেক শীর্ষ এয়ারলাইনসে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন উড়োজাহাজগুলো আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বহরে যুক্ত হবে। এতে পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু এবং কারিগরি কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি দেশের পর্যটন, বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে ইউএস-বাংলা ভারতের কলকাতা ও চেন্নাই, সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, শারজা ও আবুধাবি, কাতারের দোহা, ওমানের মাসকাট, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপের মালে এবং চীনের গুয়াংজুসহ ১০ দেশের ১৪টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশের অভ্যন্তরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর ও সৈয়দপুরে নিয়মিত ফ্লাইট রয়েছে।
বর্তমানে সংস্থাটির বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। নতুন ২১টি বোয়িং যুক্ত হলে ইউএস-বাংলার পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিনিয়োগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নয়, বরং বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করবে।








