স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১৬ বছর আগে। পাঁচ মেয়েকে অনেক কষ্টে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তাঁর সংসারে একমাত্র সঙ্গী প্রতিবন্ধী ছেলে। বয়সের ভারে শরীরও আর আগের মতো চলে না। এর মধ্যে প্রতিদিনের আরেকটি বড় কষ্ট ছিল, দূরের গ্রাম থেকে পানি এনে খাওয়া। নিজের বাড়িতে নলকূপ না থাকায় সেই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হয়েছে বছরের পর বছর। এবার বাড়ির কাছেই বসেছে সুপেয় পানির নলকূপ। এতে যেন দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার চর জিথর গ্রামের মোছা. মালেখার।
নতুন নলকূপের পাশে দাঁড়িয়ে মালেখা বলেন, ‘প্রায় ১৬ বছর হলো আমার স্বামী নাই। পাঁচ মেয়ের পর একমাত্র ছোয়ালডাও প্রতিবন্ধী। এই দূরের আরেক গাঁও থিকে পানি টানিয়া খাওয়ার কষ্টটা এবার মিটল।’

মালেখার স্বামী গিয়াস উদ্দিন মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব একাই সামলেছেন তিনি। অভাব-অনটনের মধ্যে পাঁচ মেয়েকে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। এখন প্রতিবন্ধী ছেলের দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। নিজের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে দূর থেকে পানি বয়ে আনা ছিল কষ্টের। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বাড়িতে নলকূপ বসানোর সামর্থ্যও ছিল না।
মালেখার এ দুর্ভোগের কথা জানতে পেরে তাঁর বাড়ির কাছে সুপেয় পানির নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় ময়মনসিংহ বন্ধুসভা। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চর জিথর গ্রামে প্রায় ৩২০ ফুট গভীর নলকূপ খনন করে টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। নলকূপটি থেকে মালেখার পরিবারসহ আশপাশের কয়েকটি পরিবারও পানি সংগ্রহ করতে পারবে।

পানির জন্য মাটির ৩২০ ফুট গভীরে
চর জিথর গ্রামে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। এখানে নিরাপদ পানির সন্ধান পেতে মাটির অনেক গভীরে নলকূপ খনন করতে হয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রায় ৩২০ ফুট গভীরে খনন না করলে সুপেয় পানি পাওয়া কঠিন। গভীর নলকূপ স্থাপনে খননযন্ত্রের কারিগরদের মজুরি, পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ মিলিয়ে ব্যয়ও অনেক। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে নিজস্ব নলকূপ বসানো সহজ নয়। বাধ্য হয়ে অনেককে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
চর জিথরের বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘আমাগো এদিকে পানির সমস্যা বড় সমস্যা। একে তো ভালো পানির জন্য মাটির অনেক নিচে যাওন লাগে, তাও আবার ম্যালা টেহার দরকার। এত টেহা নাই। দূর থেইকাই টান্না আইন্না খাই, কষ্ট করি।’

শাহজাহান মিয়ার কথায় উঠে আসে চর জিথর গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। এখানে সুপেয় পানি পাওয়া শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয়, অনেক পরিবারের জন্য তা আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। নলকূপ স্থাপনের সামর্থ্য না থাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থাকেন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে চর জিথরে নলকূপ স্থাপনের কাজটি সহজ ছিল না। গভীর নলকূপ খনন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় উদ্যোগটি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন ময়মনসিংহ বন্ধুসভার বন্ধুরা। তাঁদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন চর জিথরের স্থানীয় বন্ধুরাও। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
এক নলকূপে ২৫টি পরিবারের স্বস্তি
মালেখার বাড়ির কাছে নলকূপ স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুধু একটি পরিবারের পানির কষ্টই কমেনি, উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে আশপাশের আরও ২৫টি পরিবারের। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব নয়, তাদের জন্য এ উদ্যোগ স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সুপেয় পানি মানুষের মৌলিক চাহিদা। চরাঞ্চলের অনেক মানুষ আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে পারেন না। মালেখার মতো অসহায় মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তরুণেরা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। এ ধরনের মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের উদ্দেশ্য।’
মালেখার জীবনের সব অভাব হয়তো এই একটি নলকূপে ঘুচবে না। প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রামও চলবে। তবে দূরের গ্রাম থেকে পানি বয়ে আনার কষ্টটা আর আগের মতো থাকবে না। বাড়ির কাছেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা হওয়ায় তাঁর মতো বয়স্ক নারীর দৈনন্দিন জীবনে এসেছে স্বস্তি।
সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা






