জুন মাসে নেদারল্যান্ডসে ঘুরতে গেলে যে কেউ বারবার ওখানকার বাড়িগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকান। কারণ, দেশটির আবাসিক এলাকাগুলোয় বাড়ির বাইরের পতাকাদণ্ডে জাতীয় পতাকার সঙ্গে ঝুলতে দেখা যায় স্কুল ব্যাগ। প্রথম দেখায় ঘটনাটি অদ্ভুত মনে হলেও স্থানীয়দের কাছে এমন দৃশ্য বছরের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি। কিন্তু কেন এমন অদ্ভুত কাণ্ড? কেনই–বা ডাচ পরিবারগুলো তাদের সন্তানের স্কুল ব্যাগ এভাবে বাইরে ঝুলিয়ে রাখে? আর কীভাবে শুরু হয়েছিল ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখার এই মজার রীতি?
পতাকাদণ্ডে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখা এখন নেদারল্যান্ডসের সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে উঠেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই ঐতিহ্যের শুরুটা হয়েছিল হুট করে। সাধারণত বিভিন্ন দেশে স্কুলের পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে গাউন ও টুপি পরে উদ্যাপন করে। কিন্তু ডাচদের আনন্দ প্রকাশের ধরনটা একদম আলাদা।
অদ্ভুত এই নিয়ম দেখে এখন অনেকের মনে হতে পারে, এটি বুঝি শত বছরের পুরোনো কোনো রীতি। কিন্তু এই প্রথার শুরুটা খুব বেশি দিন আগের নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই রীতির প্রচলন হয়। বিখ্যাত ডাচ পত্রিকা ‘হেট পারুল’-এ ৬০-এর দশকে এই ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখার ঘটনা নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। মূলত তখন হাইস্কুল পাস করা এক কিশোরের খামখেয়ালি থেকে ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখার এই মজার রীতি শুরু হয়।
ভালুকের ভয়ে জাপানে প্রায় ১০০ স্কুল বন্ধ
ঘটনাটি ঘটেছিল আমস্টারডামের আমস্টেলকাডে এলাকায়। ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর তখন হাইস্কুলের শেষ পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায়। অবশেষে যখন সে জানতে পারল পাস করেছে, তখন তার আনন্দ আর ঠেকায় কে!
পড়ালেখা আর পরীক্ষার কোনো চাপ আর নেই ভেবে সে স্কুলের ব্যাগটি কী করবে, তা ভাবছিল। তারপর বাড়ির সামনে থাকা পতাকাদণ্ডের মাথায় ব্যাগটি ঝুলিয়ে দেয়, যাতে এলাকার সবাই জানে—সে স্কুল থেকে পাস করেছে, এখন সে পড়ালেখা থেকে স্বাধীন।
তার এই পাগলাটে আনন্দ পরে অন্যদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এর পর থেকে একের পর এক শিক্ষার্থী পাস করার পর এই কাজ করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে এই প্রথা পালনের ধরনও কিছুটা বদলেছে। এখন শুধু স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখে, এমন নয়; পরীক্ষা পাসের আনন্দ প্রকাশ করতে রাস্তার পতাকাদণ্ডগুলোতে কাগজের মালা কিংবা নোটবুকের মতো আরও নানা রকমের জিনিসও ঝুলিয়ে দিতে দেখা যায়।
স্কুল পরীক্ষা হোমওয়ার্ক এসব কোথা থেকে এলপতাকা ওড়ানো হলো জাতীয় বা ব্যক্তিগত বিজয় ও আনন্দের প্রতীক। আর স্কুলব্যাগটি হলো ফেলে আসা শিক্ষাজীবনের এক স্মারক, যা এত দিন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের সঙ্গী ছিল। পুরো স্কুলজীবন জুড়ে যে ভারী ব্যাগটি প্রতিদিন পিঠে নিয়ে যেতে হতো, পরীক্ষা পাসের পর সেই ব্যাগকেই বিজয়ের প্রতীক হিসেবে পতাকাদণ্ডে ঝুলিয়ে রাখে নেদারল্যান্ডসের শিক্ষার্থীরা।
১৯৭০ সালে এই ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখার প্রথাটি নিয়ে বেশ বড় রকমের আপত্তি উঠেছিল। কিছু মানুষ এই কাজকে তাঁদের জাতীয় পতাকার প্রতি একধরনের চরম অসম্মান বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু সেটি ছিল সত্তরের দশক, অর্থাৎ তরুণদের স্বাধীনচেতা মনোভাবের উত্থানরে সময়, তাই নেদারল্যান্ডসে প্রতিবাদকারীদের এই আপত্তি কেউ গায়ে মাখেনি। উল্টো তাদের শান্ত থাকতে বলে তরুণেরা এই সুন্দর আনন্দ উদ্যাপন চালিয়ে যান। পরবর্তীকালে ১৯৯০ সাল থেকে এই প্রথা নেদারল্যান্ডস পুরোপুরি স্বাভাবিক ও একটি চমৎকার আনন্দময় উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে।
সূত্র: ডাচ নিউজঋতুপর্ণারা যে স্কুল থেকে উঠে এসেছেন, সে স্কুলেই নেই খাবার আর খেলার সরঞ্জাম






