গত এপ্রিলে নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের নভোযান ইন্টিগ্রিটি যখন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে নিরাপদে আছড়ে পড়ল, নাসার ধারাভাষ্যকার রব নাভিয়াস তখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘জুল ভার্নের পাতা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের চন্দ্রাভিযান—আমাদের মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন একটি অধ্যায় আজ পূর্ণ হলো।’

রব নাভিয়াস কথাটা নেহাত আবেগের বশে বলেননি। আর্টেমিস ২ মিশনের পুরো গতিপথ, চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার ধরন; সবকিছুর সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লেখা ফরাসি লেখকের গল্পের অদ্ভুত মিল রয়েছে।

জুল ভার্নের লেখা জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ উপন্যাসের প্রচ্ছদ

তাঁর সমসাময়িক লেখকেরা অন্য গ্রহে যাওয়ার জন্য যখন বেলুনের মতো আজগুবি সব যানের কথা কল্পনা করছিলেন, তখন জুল ভার্ন লিখছিলেন মুক্তিবেগ, অরবিটাল স্লিংশট এবং গতিপথ সংশোধনের মতো নিখুঁত বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে!

বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অন্যতম জনক বলা হয় জুল ভার্নকে। যে যুগে সাবমেরিন আবিষ্কৃত হয়নি, সে যুগে তিনি লিখেছেন টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সিজার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ উপন্যাসে পাঠকদের নিয়ে গেছেন পৃথিবীর কেন্দ্রে। তবে তাঁর চতুর্থ উপন্যাসটি ছিল একটু অন্য রকম। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত সেই উপন্যাসের নাম ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন

নাসার আর্টেমিস মিশন কী ও কেন
যে যুগে সাবমেরিন আবিষ্কৃত হয়নি, সে যুগে জুল ভার্ন লিখেছেন টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি। জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ উপন্যাসে পাঠকদের নিয়ে গেছেন পৃথিবীর কেন্দ্রে।

দুই

গল্পের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। বাল্টিমোর গান ক্লাবের সদস্যরা হঠাৎ বেকার হয়ে পড়েছেন। কারণ, যুদ্ধ না থাকলে তো আর কামান বা গোলার কোনো দরকার নেই। ক্লাবের সভাপতি ইম্পে বার্বিকেন তখন তাঁর সদস্যদের দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য এক নতুন প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, এমন একটা বিশাল কামান তৈরি করতে হবে, যার গোলা সোজা গিয়ে চাঁদে পৌঁছাবে।

জুল ভার্ন ছিলেন তথ্য ও পরিসংখ্যানের প্রতি চরম আচ্ছন্ন মানুষ। উপন্যাসে তিনি বার্বিকেনের সেই ৯০০ ফুট লম্বা কামানের গণিত ও বিজ্ঞান খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি সেই গোলার গতিপথ কেমন হবে, তারও বিস্তারিত হিসাব তিনি কষে দেখিয়েছিলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো কলাম্বিয়াড স্থাপনের জায়গা নির্বাচন। জুল ভার্ন তাঁর উপন্যাসে কামানের ঘাঁটি হিসেবে ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সের কাছের একটি জায়গাকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নিরক্ষীয় রেখার যতটা সম্ভব কাছাকাছি থেকে উৎক্ষেপণ করলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে গোলাটি অতিরিক্ত গতি পাবে। দশক পেরিয়ে নাসা যখন মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালকে বেছে নিল, তখন তাদের বৈজ্ঞানিক যুক্তিটাও ছিল ঠিক একই। ফোর্ট মায়ার্স এবং কেপ ক্যানাভেরাল ফ্লোরিডা উপদ্বীপের ঠিক দুই বিপরীত দিকে হলেও, তাদের অক্ষাংশ প্রায় সমান।

আর্টেমিস ৩ মিশনের জন্য ৪ নভোচারীর নাম ঘোষণা করল নাসা
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো কলাম্বিয়াড স্থাপনের জায়গা নির্বাচন। জুল ভার্ন তাঁর উপন্যাসে কামানের ঘাঁটি হিসেবে ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সের কাছের একটি জায়গাকে বেছে নিয়েছিলেন।

গল্প যত এগোতে থাকে, ফরাসি অভিযাত্রী মাইকেল আর্দান কলাম্বিয়াডের সেই ফাঁপা গোলার ভেতর যাত্রী হতে রাজি হন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন স্বয়ং বার্বিকেন এবং তাঁর চিরশত্রু ক্যাপ্টেন নিকোল।

তবে এখানেই জুল ভার্নের কল্পনার প্রথম বড় বৈজ্ঞানিক ভুলটি ধরা পড়ে। আধুনিক রকেটগুলো কয়েক মিনিট ধরে ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে মুক্তিবেগে পৌঁছায়। এতে নভোচারীদের ওপর প্রবল অভিকর্ষজ বল কাজ করলেও তাঁরা বেঁচে থাকেন। কিন্তু কামানের গোলা তো এক মুহূর্তের মধ্যেই সর্বোচ্চ গতিতে ছিটকে বের হয়। বাস্তবে এমনটা ঘটলে প্রচণ্ড জি-ফোর্সের চাপে বার্বিকেন, নিকোল ও আর্দান নিমিষেই পিষ্ট হয়ে তরলে পরিণত হতেন! এছাড়াও আরও কিছু বৈজ্ঞানিক ভুল আছে ভার্নের এই উপন্যাসে।

যাই হোক, উপন্যাসে সফলভাবেই গোলার উৎক্ষেপণ হয়। চার বছর পর, ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত সিক্যুয়াল অ্যারাউন্ড দ্য মুন উপন্যাসে এ গল্পের পরের অংশ তুলে ধরেন জুল ভার্ন। বার্বিকেনের ইচ্ছা ছিল গোলাটা সরাসরি চাঁদে আঘাত করবে। কিন্তু বাস্তবে গোলাটি একটি ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরিতে ঢুকে পড়ে। ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি মানে এমন একটি মহাকাশপথ, যেখানে কোনো নভোযান চাঁদের মহাকর্ষের টানে ঘুরে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার না করেই আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। উপন্যাসেও গোলাটি চাঁদের উল্টো পিঠ ঘুরে আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। আর্টেমিস ২ মিশনের ক্ষেত্রেও নভোযানের গতিপথ ছিল ঠিক এমনটাই।

আর্টেমিস ২ মিশনের ১২ হাজার চাঁদের ছবি প্রকাশ করেছে নাসা, দেখবেন যেভাবে
ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি মানে এমন একটি মহাকাশপথ, যেখানে কোনো নভোযান চাঁদের মহাকর্ষের টানে ঘুরে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার না করেই আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে।

তিন

উপন্যাসের কিছু বর্ণনা আধুনিক পাঠকের কাছে বেশ হাস্যকর লাগতে পারে। জুল ভার্ন তাঁর যাত্রীদের অক্সিজেন তৈরি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেওয়ার জন্য রাসায়নিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মহাশূন্যের ভেতর যে জানালা খোলা যায় না, সেটা তিনি মানতে চাননি। তাঁর যাত্রীরা কয়েকবার মহাকাশযানের জানালা খুলেছিলেন! তবে শর্ত ছিল, কাজটা খুব দ্রুত করতে হবে!

তা ছাড়া, আধুনিক নভোচারীরা যেখানে শুকনা বা ডিহাইড্রেটেড খাবার খান, সেখানে ভার্নের যাত্রীরা নভোযানের ভিক্টোরিয়ান আমলের সাজসজ্জা করা বড়সড় রুমে বসে দামি ওয়াইনের সঙ্গে রীতিমতো রাজকীয় ভোজ সেরেছিলেন। আর্টেমিস ২ মিশনের রিড ওয়াইজম্যান এবং তাঁর দলের শুকনা রেশনের চেয়ে এই জীবনযাত্রা ছিল একেবারেই আলাদা।

ভার্নের আরেকটি ভুল ছিল মহাকর্ষ নিয়ে। তাঁর ধারণা ছিল, গোলার যাত্রীরা শুধু সেই নিরপেক্ষ বিন্দুতেই ওজনহীনতা অনুভব করবেন, যেখানে পৃথিবী এবং চাঁদের মহাকর্ষ বল সমান। বাকিটা সময় তাঁরা গোলার মেঝেতেই আটকে থাকবেন। পাঠক, এখানে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, জুল ভার্নের যুগে মানুষের ওজনহীনতার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতাই ছিল না। তাই সেই যুগে বসে এমন একটা ব্যাপার কল্পনা করাটা মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়।

ছবিতে দেখুন আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের পৃথিবীতে ফেরা
জুল ভার্নের ধারণা ছিল, গোলার যাত্রীরা শুধু সেই নিরপেক্ষ বিন্দুতেই ওজনহীনতা অনুভব করবেন, যেখানে পৃথিবী এবং চাঁদের মহাকর্ষ বল সমান। বাকিটা সময় তাঁরা গোলার মেঝেতেই আটকে থাকবেন।

আর্টেমিস ২ মিশনের ক্রুদের মতোই বার্বিকেন এবং তাঁর সঙ্গীরা যাত্রাপথে চাঁদের পৃষ্ঠ খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। চাঁদের বর্ণনার ক্ষেত্রে জুল ভার্ন প্যারিসের লাইব্রেরিগুলোতে বসে করা তাঁর বিস্তর গবেষণার ওপরই নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর মহাকাশযানটি চাঁদের উল্টো পিঠে পৌঁছায়, তখন চারপাশ গভীর অন্ধকারে ঢেকে যায়। সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো অবস্থায় তাঁরা হঠাৎ দূরে একটি আলোর ঝলক দেখতে পান।

এই বর্ণনাটা আর্টেমিস ২ মিশনের একটি ঘটনার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। চাঁদের অন্ধকার দিকে মহাকাশচারীরা যখন ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত দেখেছিলেন, ঠিক তখন তাঁরাও এমন আলোর ঝলকানিই দেখেছিলেন। নাসার সায়েন্স ইভ্যালুয়েশন রুমের বিজ্ঞানীরা সেদিন এই দৃশ্য দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলেন।

জুল ভার্ন তাঁর যুগের বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী ওই আলোকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পরেই তিনি আবার লিখেছেন, নভোযানের কাছাকাছি একটি উল্কাপিণ্ড বিস্ফোরিত হয় এবং হাজার হাজার উজ্জ্বল টুকরো চারদিকে উড়তে থাকে। নাসার এসইআর দল এমন কিছু দেখলে কেমন প্রতিক্রিয়া জানাত, তা কেবল কল্পনাই করা যায়!

দ্বিতীয়বারের মতো যখন নভোযানটি নিরপেক্ষ মহাকর্ষ বিন্দুতে পৌঁছায়, তখন যাত্রীরা ভয় পান যে তাঁরা হয়তো সেখানেই আটকে থাকবেন। তখন জুল ভার্ন তাঁর চরিত্রদের দিয়ে আতশবাজির মতো রকেট ব্যবহার করে মহাকাশযানের গতিপথ সংশোধনের চেষ্টা করান। যদিও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কিন্তু গোলার নিজস্ব জড়তার কারণেই সেটি আবার পৃথিবীর দিকে পড়তে থাকে।

চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে আর্টেমিস ২ নভোচারীদের পাঠানো চোখধাঁধানো সব ছবি
নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, ‘এক শ বছর আগে জুল ভার্ন চাঁদে যাওয়ার একটা বই লিখেছিলেন। তাঁর নভোযান কলাম্বিয়া ফ্লোরিডা থেকে উড়েছিল এবং চাঁদ ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগরে এসে নেমেছিল।’

বার্বিকেন, নিকোল ও আর্দান শেষ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরেই এসে পড়েন। প্যারাসুট ছাড়া ওই প্রচণ্ড গতিতে আছড়ে পড়েও তাঁরা কীভাবে যেন বেঁচে যান! ঠিক অ্যাপোলো এবং আর্টেমিস মিশনের মতোই, মার্কিন নৌবাহিনী গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। উপন্যাসের শেষ দিকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় রাস্তায় এই তিন অভিযাত্রীকে নিয়ে বিজয় মিছিল হচ্ছে, যা বাস্তব চন্দ্রাভিযানের উৎসবেরই এক নিখুঁত পূর্বাভাস।

১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনে পৃথিবীতে ফেরার পথে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, ‘এক শ বছর আগে জুল ভার্ন চাঁদে যাওয়ার একটা বই লিখেছিলেন। তাঁর নভোযান কলাম্বিয়া ফ্লোরিডা থেকে উড়েছিল এবং চাঁদ ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগরে এসে নেমেছিল।’

আজ, প্রায় ১৬০ বছর পর, আর্টেমিস মিশনের যুগে দাঁড়িয়ে যখন জুল ভার্নের সেই কল্পনানির্ভর মহাকাশযাত্রার গল্প পড়ি, তখন অবাক হতে হয়। মানুষের কল্পনা কীভাবে শত বছর আগের বইয়ের পাতা থেকে ভবিষ্যতের বাস্তবতায় ডানা মেলে, জুল ভার্নের এই উপন্যাস তারই এক বিস্ময়কর প্রমাণ!

সূত্র: স্পেস ডটকম; জুল ভার্ন, ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন

ঘরে ফিরলেন আর্টেমিস ২ মিশনের ৪ নভোচারী