বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্ণ হতে আর মাত্র চার বছর বাকি। একজন মানুষ এক জীবনে কয়টা বিশ্বকাপ দেখতে পারে? কারোর মনে হয়তো এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। কেউবা বলবেন ৩টা কেউ ৫টা আবার কেউ ৭-৮টা বলবেন। কিন্তু একজন আর্জেন্টাইন ক্রীড়া সাংবাদিক, যিনি মাত্র চারটি বিশ্বকাপ বাদে বাকি সবগুলোই কভার করেছেন। ৯১ বছর বয়সী এই সাংবাদিকের নাম এনরিকে মাকাইয়া মার্কেজ।
বিশ্বকাপের জীবন্ত ইতিহাস এনরিকে মাকাইয়া মার্কেজ। বিশ্বকাপের সঙ্গে এনরিকে মাকাইয়া মার্কেজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ১৯৫৮ সালে তার বিশ্বকাপ কভার করার যাত্রা শুরু, যেখানে তিনি ফুটবলে পেলের উত্থান প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
এর ২০ বছর পর তিনি আর্জেন্টিনার মাটিতে দেশটির প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী হন। এরপর কাছ থেকে দেখেছেন দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্থান এবং ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
দশকের পর দশক পেরিয়ে ৮৮ বছর বয়সে কাতার বিশ্বকাপেও তিনি উপস্থিত ছিলেন, যেখানে লিওনেল মেসির হাত ধরে আর্জেন্টিনা জিতেছিল তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
এবার ৯১ বছর বয়সে এসে তিনি টানা ১৮টি বিশ্বকাপ কভার করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে বেশি বার কভার করার জন্য ফিফা স্বীকৃত রেকর্ডও রয়েছে তার নামে।
আর্জেন্টিনার সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন এক মুহূর্তের জন্ম দিলেন ৯১ বছর বয়সী এই সাংবাদিক। বিশ্বকাপ কভার করতে এসে এটি তার টানা ১৮তম আসর। এই ৯১ বছর বয়সী সাংবাদিক আজকে উপস্থিত ছিলেন লিওনেল স্কালোনির সাংবাদিক সম্মেলনে। তার করা একটি প্রশ্নকে স্বভাবতই সম্মান দেখালেন স্কালোনি। অন্য যে কোন সাংবাদিক এই প্রশ্নটি করলে তিনি এড়িয়ে যেতেন বলেও জানান আর্জেন্টিনা কোচ।
জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সহকর্মীরা করতালির মাধ্যমে তাকে সম্মান জানান। এরপর তিনিই প্রথম প্রশ্ন করার সুযোগ পান এবং এমন একটি উত্তর আদায় করে নেন, যা সাধারণত কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচের আগে প্রকাশ করেন না- লিওনেল মেসি শুরুর একাদশে থাকছেন না, বেঞ্চ থেকেই ম্যাচ শুরু করবেন।
প্রশ্ন করার আগে মার্কেজ বলেন, ‘আমি দুটি প্রশ্ন করতে চাই, যা পুরো সংবাদ সম্মেলনের সারসংক্ষেপ হবে। আমার সহকর্মীরা হয়তো এজন্য আমাকে মেরে ফেলবেন! কিন্তু আমি চাই আপনি উত্তর দিন। প্রথম প্রশ্ন, মেসি কি খেলবে? আর দ্বিতীয়টি, দল কিভাবে সাজাবেন?’ তার প্রশ্ন শেষ হতেই উপস্থিত সাংবাদিকরা করতালিতে ফেটে পড়েন।
এরপর অত্যন্ত আন্তরিকভাবে জবাব দেন স্কালোনি। ‘উত্তর দেওয়ার আগে, এনরিকে, আপনাকে এখানে দেখে আমি সত্যিই আনন্দিত। আসার জন্য ধন্যবাদ। আপনি ১৮টি বিশ্বকাপ কভার করেছেন- অবিশ্বাস্য! আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের। আমরা অনেক বছর ধরে একে অপরকে চিনি। আমি যখন আর্জেন্টিনায় খেলতাম, তখন আপনাকে সব সময় দেখতাম। আপনি যখন কথা বলতেন, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ছিল। এখনও তাই। আমি শুধু আপনার জন্যই এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। অন্য কেউ করলে আমি এড়িয়ে যেতাম। আপনি এই সম্মানের যোগ্য।’
এরপরই স্কালোনি নিশ্চিত করেন, মেসি জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচটি বেঞ্চে বসেই শুরু করবেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে স্কালোনি নিজে এগিয়ে গিয়ে প্রবীণ এই সাংবাদিককে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের প্রতি এটি ছিল তার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতির প্রতীক।
১৯৩৪ সালের ২০ নভেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে জন্ম নেওয়া মাকাইয়া, যাকে সবাই স্নেহ করে শুধু ‘মাকাইয়া’ বলেই ডাকেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে ঐতিহ্যবাহী আর্জেন্টাইন রেডিও প্রতিষ্ঠান রিভাদাভিয়া-তে সাংবাদিকতা শুরু করেন।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি রেডিও বেলগ্রানো-এর প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ কভার করতে যান। সেখান থেকেই বিশ্বকাপের সঙ্গে শুরু হয় তার আজীবনের সম্পর্ক। এরপর আর একটি বিশ্বকাপও তিনি মিস করেননি।
২০২২ সালে, ৮৮ বছর বয়সে কাতার বিশ্বকাপ কভার করার সময় ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (এআইপিএস) এবং ফিফা তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। টানা ১৭টি বিশ্বকাপ কভার করে বিশ্বের সর্বাধিক বিশ্বকাপ কভার করা সাংবাদিক হিসেবে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েন।
কিন্তু সেখানেই থামেননি তিনি। গত সপ্তাহে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল (কনমেবল) তাদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ১৮তম বিশ্বকাপ কভার করতে আসা মাকাইয়াকে সম্মান জানায়।
পোস্টে লেখা হয়, ‘ফুটবলের স্মৃতি আর আবেগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উৎসর্গ করা একটি জীবন। আবেগ, অভিজ্ঞতা ও উত্তরাধিকার।’
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনেও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তার নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
২০২২ সালে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাকাইয়া ১৯৫৮ সালের প্রথম বিশ্বকাপ সফরের স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সুইডেনে যাওয়ার সেই সফর ছিল আমার জীবনের প্রথম দিককার উড়োজাহাজ ভ্রমণ। তখন প্রপেলার বিমান ছিল, মাঝপথে জ্বালানি নিতে থামতে হতো, কারণ একটানে উড়তে পারত না। আমরা রেডিওতে ধারাভাষ্য পাঠাতাম, কিন্তু সেটি আদৌ আর্জেন্টিনায় পৌঁছাবে কি না, সেটাও জানতাম না।’
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বিশ্বকাপই এখনও তাকে সমানভাবে রোমাঞ্চিত করে। ‘এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে দেখছেন, কিভাবে বিশ্লেষণ করছেন এবং কি শিখতে চাইছেন তার ওপর। আমরা তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিই। তাই যা জানি, তা নিয়ে আমাদের পুরোপুরি নিশ্চিত থাকতে হয়।’
শুধু বিশ্বকাপ নয়, আর্জেন্টাইন ফুটবল সাংবাদিকতারও এক অবিচ্ছেদ্য নাম এনরিকে মাকাইয়া মার্কেজ। ১৯৮৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ফুটবল দে প্রিমেরা’-এর উপস্থাপক ছিলেন। সেখানে আর্জেন্টিনার প্রথম বিভাগের প্রতিটি রাউন্ডের ম্যাচের হাইলাইটস, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য প্রচার করা হতো।
সে সময় সরাসরি ম্যাচ দেখার সুযোগ ছিল কেবল অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন নেওয়া দর্শকদের জন্য। ফলে এই অনুষ্ঠানই ছিল সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নিজেদের প্রিয় দলের খেলার একমাত্র জানালা। এভাবেই অনুষ্ঠানটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
আরআর/আইএইচএস/








