২৩ বছর, ২৩২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ১৪৬টি গোল আর ছয়-ছয়টি বিশ্বকাপের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। ৪১ বছর বয়সে এসে অবশেষে সেই ধ্রুব সত্যটাই মেনে নিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর হাই-ভোল্টেজ মহারণের আগে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিলেন, এটাই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ট্রফি ক্যাবিনেটে সোনালী ট্রফিটা শেষ পর্যন্ত না উঠলেও কোনো আফসোস নেই পর্তুগিজ মহাতারকার। শত সমালোচনা আর ব্যক্তিগত আক্রমণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ‘সিআরসেভেন’ বিদায় নিতে চান একদম শান্ত, নির্ভার মনে।সমালোচকদের প্রতি রোনালদোর চ্যালেঞ্জ ও ক্ষোভস্পেনের বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে পর্তুগাল অধিনায়ককে দেখা গেল এক অদ্ভুত রূপে—কখনও তিনি আত্মবিশ্বাসী, কখনও হাসিখুশি, আবার কখনও বা ভীষণ আবেগপ্রবণ। ভবিষ্যৎ এবং তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র সমালোচনা নিয়ে প্রশ্ন করতে মুখিয়ে থাকা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রোনালদো অকপটে স্বীকার করেন, "আমি আগের সেই খেলোয়াড়টি আর নেই।"অবশ্য পর্তুগালের এই ফরোয়ার্ড যোগ করেন, "আমি খুব একটা খারাপও করছি না।" এবারের বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই তিনি তিনটি গোল করেছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, "১৮ বছর বয়স থেকেই ব্যাপারটা এমন হয়ে আসছে, এটা বদলানোর নয়।"আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও প্রশ্ন করা হলে রোনালদো ক্ষোভের সুরে পাল্টা জবাব দেন, "আপনারা গত ২৩ বছর ধরে আমাকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে এর কোনো মূল্য নেই। এটা স্রেফ সময়ের অপচয়! তবুও আপনারা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন।" আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ এই গোলদাতা আরও বলেন, "আমি এসবে ভীষণ অভ্যস্ত।"ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা ও ১০০০ শতাংশ পরিষ্কার বিবেকসংবাদ সম্মেলন শেষে করতালির মাধ্যমে বিদায় নেওয়া রোনালদো যোগ করেন, "বিশ্বকাপ জিতলেই যে আমি হুট করে অনেক বড় ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো হয়ে যাব, আর না জিতলে ছোট হয়ে যাব, ব্যাপারটা এমন নয়। বয়স মানুষকে সেই পরিপক্বতা আর অভিজ্ঞতা দেয়, যা দিয়ে বোঝা যায় জীবনের সবকিছুর গুরুত্ব আসলে আপেক্ষিক। ৪০ পার হওয়ার পর আমার ওপর যেসব সমালোচনা বা আক্রমণ হয়েছে, সেগুলোর জন্য আমি ধন্যবাদই জানাব... কারণ সমালোচনা থেকেই মানুষ শিখতে ও বড় হতে পারে। তাই এই সমালোচনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।"এমনকি একজন নির্দিষ্ট সাংবাদিককে ইঙ্গিত করে রোনালদো বলেন, "আমি জানি ও আমাকে পছন্দ করে না" এবং তাকে একটি প্রশ্ন করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। মুচকি হেসে বলেন, "আপনাদের সঙ্গে, বিশেষ করে আপনাদের মধ্যে যারা আমাদের পছন্দ করেন না তাদের সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগে—আমি মানুষের মুখ খুব ভালো মনে রাখতে পারি।"বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে নিজের অবসর প্রসঙ্গে রোনালদো স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, "কয়েক বছর আগে যেমনটা বলেছিলাম, আমি যখন চাইব তখনই থামব, আপনারা যখন চাইবেন তখন নয়। আমি মনে করি, একই প্রশ্ন বারবার করা সময়ের অপচয়। আমি নিজের দিকে মনোযোগ টানতে চাই না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগামীকাল আমরা ভালো খেলি এবং পরের রাউন্ডে যাওয়ার বিশ্বাস রাখি।"তিনি আরও বলেন, "আগামীকাল যা-ই ঘটুক না কেন, ক্রিস্তিয়ানো এখান থেকে হাজার ভাগ পরিষ্কার বিবেক নিয়েই বিদায় নেবে। ১০০ শতাংশ নয়, ১০০০ শতাংশ পরিষ্কার। আমি ফুটবল এবং আমার জীবনের জন্য যা কিছু দেওয়ার, সবই দিয়েছি। আবেগ, ইচ্ছা- সব দিয়েছি। কোনো অভাব বা প্রয়োজনের তাগিদে আমি খেলিনি। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, জীবনে আমি খুব ভালো অবস্থানে আছি। আমি খেলেছি শুধু ফুটবল খেলার প্রতি ভালোবাসা থেকে।"নিজের অর্জন নিয়ে তার শেষ কথা, "বিশ্বকাপ জিতলে আমি আরও বড় ক্রিস্তিয়ানো হয়ে যাব না, আবার না জিতলেও ছোট হয়ে যাব না। জীবনে আমার কোনো কিছুর অভাব নেই। ঈশ্বর আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় হয়েছেন এবং আমি যা কখনও জেতার আশা করিনি, তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। এখন প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করাই মূল বিষয়।"