যে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর একদিন দেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, চার দশক পর সেটিই এখন পরিত্যক্ত স্থাপনা। ১৯৮৫ সালে ঢাকার ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকায় প্রায় ১৬ একর জমির ওপর ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তবে অর্থসংকট ও উদ্যোক্তার মৃত্যুর কারণে দীর্ঘ ৪০ বছরেও হাসপাতালটি চালু না হয়ে বর্তমানে এটি মাদকসেবীদের আড্ডা ও পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় ভবনগুলো ঘিরে জন্মেছে ঘন ঝোপঝাড়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্শী ও পাইকপাড়া গ্রামের সীমানাজুড়ে নির্মিত বিশাল হাসপাতাল কমপ্লেক্সে নেই কোনো চিকিৎসাসেবা ও জনসমাগম। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা, মসজিদ, পুকুরসহ বিভিন্ন স্থাপনা এখন নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি অপূর্ণ স্বপ্নের। অধিকাংশ ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। চারপাশে আগাছা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে চলাচলের পথ।

৩০০ কোটির হাসপাতাল, ৪০ বছর পর শুধুই ঝোপঝাড়

সূত্র জানায়, ১৯৮৫ সালে শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবাল তার প্রয়াত বাবার স্মৃতিকে ধারণ করে একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ক্যান্সারে বাবাকে হারানোর পর দেশের মানুষ যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হন—এই লক্ষ্য নিয়েই প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ চললেও অর্থসংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানা জটিলতায় প্রায় ২০ বছর আগে কাজ থেমে যায়।

বর্তমানে প্রকল্পটি ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‌খান মোহাম্মদ ইকবালের বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসার জন্য তাকে বিভিন্ন দেশে নিতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি দেশে একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা পূর্ণতা পায়নি।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবালের মৃত্যুর পর প্রকল্পটির কার্যক্রম একেবারেই স্থবির হয়ে পড়ে। সরকার বা কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি এটি চালুর দায়িত্ব নেয়, তাহলে মালিকপক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

স্থানীয়দের মতে, হাসপাতালটি চালু হলে শুধু ধামরাই নয়, সাভার, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার লাখো মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ পাবেন।

৩০০ কোটির হাসপাতাল, ৪০ বছর পর শুধুই ঝোপঝাড়

ধামরাই সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আবীর বলেন, এত বড় একটি হাসপাতাল পরিত্যক্ত পড়ে থাকা খুবই দুঃখজনক। এটি চালু হলে পুরো অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন। এখন শুধু ভবনগুলো নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, এখানে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, তা যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে চার জেলার মানুষের চিকিৎসার বড় একটি কেন্দ্র হতে পারে। প্রয়োজন শুধু আন্তরিক উদ্যোগ।

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, প্রকল্পটি একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে শুরু করেছিলেন। উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে। হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে কাজ চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। তাদের দাবি, সরকার, উদ্যোক্তা পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা হোক। তাহলে একদিকে যেমন অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে রাজধানীর অদূরে একটি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠবে, যা লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এসজেডএইচ/জেআইএম