- ৪২ হাজার বোতলে নির্মাণ বাড়ি
- নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪০ লাখ
- ইটের তুলনায় অর্ধেক খরচ
যে প্লাস্টিকের বোতল একবার ব্যবহার শেষে ডাস্টবিন, ড্রেন কিংবা নদীতে গিয়ে পরিবেশ দূষণের কারণ হয়, সেই বোতলই এবার হয়ে উঠেছে একটি বাড়ির দেয়াল। ইউটিউবে বিদেশের নির্মাণপ্রযুক্তির ভিডিও দেখে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার এক গৃহবধু ৪২ হাজার পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে নির্মাণ করেছেন ব্যতিক্রমধর্মী একটি বাড়ি। প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট আয়তনের এই বাড়ি নির্মাণে জমিসহ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
গৃহবধুর দাবি, একই আয়তনের ইটের বাড়ি নির্মাণের যে খরচ হতো, তার তুলনায় এ বাড়ি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে অর্ধেক।
দুপচাঁচিয়ার এ বাড়িটি এখন স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বোতল বাড়ি’ নামে। প্রতিদিন দূরদূরান্তের মানুষ বাড়িটি দেখতে আসছেন। কেউ নির্মাণকৌশল জানতে চান, কেউ ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নিয়ে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও আলোচনা।

বাড়িটি তৈরি করছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার শাহারপুকুর এলাকায় বাসিন্দা টুম্পা আক্তার (৩০)। তিনি একজন গৃহিণী। বাড়িটি নির্মাণে অর্থ দিয়েছেন তার মা আফরোজা বেগম। টুম্পার স্বামী মোহাম্মদ বাপ্পী পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি গাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসা করেন।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
তরমুজের খোসা হতে পারে আয়ের উৎস
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে ইউটিউবে বিদেশের বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে নির্মিত পরিবেশবান্ধব বাড়ির ভিডিও দেখেন টুম্পা। ভিডিওগুলোতে দেখানো হয়, খালি প্লাস্টিকের বোতলে বালু ভরে সেগুলো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বিষয়টি তাকে অনুপ্রাণিত করে। এরপর তিনি আরও বিভিন্ন ভিডিও দেখে নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেন। ঢাকায় থাকাকালে তার এক বান্ধবীর স্বামী, যিনি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তার সঙ্গে পরামর্শ করে নির্মাণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
এরপর শুরু হয় বোতল সংগ্রহের কাজ। স্থানীয় দোকান, বাজার, বাসাবাড়ি এবং পরিচিতজনদের কাছ থেকে হাজার হাজার প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি বোতল পরিষ্কার করে শুকিয়ে তাতে শক্তভাবে বালু ভরে মুখ বন্ধ করা হয়। পরে বিশেষ কৌশলে বোতলগুলো সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণে দেয়াল নির্মাণ করা হয়। বাইরে থেকে প্লাস্টার করা হলেও দেয়ালের ভেতরে রয়েছে প্লাস্টিকের বোতলের স্তর।

থেমে থেমে কাজ করার কারণে প্রথম তলার নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লাগে প্রায় আট থেকে নয় মাস। এতে ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার প্লাস্টিকের বোতল। নির্মাতার পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় তলা নির্মাণে আরও প্রায় ২৫ হাজার বোতল প্রয়োজন হবে।
নির্মাতা গৃহবধু বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য প্লাস্টিকের বোতল ফেলে দেওয়া হয়। এগুলো সহজে মাটির সঙ্গে মিশে না। আমি ভাবলাম, যদি এগুলো দিয়েই একটি বাড়ি তৈরি করা যায়, তাহলে পরিবেশেরও উপকার হবে, আবার নির্মাণ ব্যয়ও কমবে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা
তিনি জানান, শুরুতে পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। গ্রামের অনেকেই বলেছিলেন, বোতল দিয়ে আবার বাড়ি হয় নাকি? কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সেই ধারণা বদলে যায়। এখন অনেকেই বাড়িটি দেখতে আসেন এবং একই ধরনের নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
স্থানীয় কয়েকজন রাজমিস্ত্রি জানান, প্রথম দিকে তারা এ প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ইউটিউবের ভিডিও দেখেই ধাপে ধাপে কাজ শেখেন। তাদের দাবি, বালু দিয়ে শক্তভাবে ভর্তি করা বোতলগুলো দেয়ালকে বেশ মজবুত করেছে। তবে বড় ধরনের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, প্রথমে মনে হয়েছিল এটি টিকবে না। কিন্তু বাড়িটা দেখে এখন মনে হচ্ছে, ফেলে দেওয়া জিনিসও যে কাজে লাগানো যায়, সেটা এই বাড়ি না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
আরেক বাসিন্দা শাহিনা বেগম বলেন, এখন প্রায় প্রতিদিনই মানুষ বাড়িটি দেখতে আসে। আমাদের গ্রামের জন্য এটি নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ বলেন, বগুড়া পৌরসভা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশই প্লাস্টিক ও পলিথিনজাতীয় বর্জ্য। এসব বর্জ্যের কার্যকর পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যারা এ কাজটি করছে তারা পরিবেশের উপকারই করছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য এখন বাংলাদেশের অন্যতম পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
ফলের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে জুতা-ব্যাগ! ফ্যাশনে সবুজ বিপ্লব
তবে নির্মাণ নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্থপতি আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বাড়ি নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। শখের বশে বা পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে স্ট্রাকচারাল দৃষ্টিকোণ থেকে বোতলকে ভবন নির্মাণের উপকরণ হিসেবে সমর্থন করা যায় না। ভবনের নিরাপত্তা নির্ভর করে ভিত্তি, কলাম, বিম, লোড বহনক্ষমতা ও প্রকৌশল নকশার ওপর। তাই স্থায়ী বসবাসের উপযোগী ভবন নির্মাণে প্রচলিত প্রকৌশল মান ও বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করাই উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে বাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের উদাহরণ রয়েছে। এ ধরনের নির্মাণে একদিকে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয়ও কমে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে প্রকৌশলগত মূল্যায়ন অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পরিবেশবিদ আব্দুল কাদেরের মতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হলেও তার বড় অংশ পুনর্ব্যবহার হয় না। ফলে নদী, খাল, ড্রেন, কৃষিজমি ও উন্মুক্ত পরিবেশে প্লাস্টিক জমে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের নতুন উদ্যোগগুলো পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
দেশে যেভাবে নির্ধারণ করা হয় চিত্রকর্মের দাম
দুপচাঁচিয়ার গৃহবধু টুম্পার স্বপ্ন এখন আরও বড়। দ্বিতীয় তলা নির্মাণ শেষ করে পুরো ভবনটিকে পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে গড়ে তুলতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, মানুষ যেসব জিনিসকে আজ আবর্জনা মনে করছে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে সেগুলোই একদিন মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ শুরুতে হাসবে, সন্দেহ করবে। কিন্তু নতুন কিছু করতে গেলে সাহস লাগেই। আমি চাই, মানুষ বুঝুক ফেলে দেওয়া জিনিসও সম্পদ হতে পারে, যদি আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি।
এল.বি/কেএইচকে








