জার্মানির ৪৪ বছরের অজেয় সাম্রাজ্যের পতন, যে রাতে ভেঙে গেল ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর দল জার্মানির রেকর্ড!

"ফুটবল খুবই সহজ একটি খেলা। ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট বলের পেছনে দৌড়ায়, আর শেষ পর্যন্ত জয়টা হয় জার্মানির।"

ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার গ্যারি লিনেকারের এই বিখ্যাত উক্তি শুধু একটি রসিকতা ছিল না। বছরের পর বছর ধরে বড় টুর্নামেন্টে জার্মানির মানসিক দৃঢ়তা, জয়ের ক্ষুধা আর অসাধারণ স্নায়ুশক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই কথাটি। বিশেষ করে ম্যাচ যদি গড়ায় টাইব্রেকারে, তখন যেন প্রতিপক্ষের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেত। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

সব সাম্রাজ্যেরই একদিন পতন হয়

২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে বোস্টন স্টেডিয়ামে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল প্যারাগুয়ে। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ১-১ সমতা। এরপর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় করে দেয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে জার্মানির টানা ৪৪ বছরের অপরাজেয় যাত্রার অবসান ঘটে।

যে ইতিহাসের শুরু ১৯৮২ সালে

জার্মানির এই কিংবদন্তির জন্ম ১৯৮২ বিশ্বকাপে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোরলাইন ছিল ৩-৩। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই ৫-৪ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে পশ্চিম জার্মানি।

সেই টাইব্রেকারে উলি স্টিলিকের একটি শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন ফরাসি গোলরক্ষক জ্যঁ লুক এতোরি। সেটিই ছিল বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে কোনো জার্মান ফুটবলারের একমাত্র ব্যর্থতা। কিন্তু সেই একটি ভুলের পর যেন আরও অদম্য হয়ে ওঠে জার্মানি।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক মেক্সিকোকে ৪-১ ব্যবধানে হারায় তারা। ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারায় ৪-৩ ব্যবধানে। এরপর ২০০৬ বিশ্বকাপে বার্লিনে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে চার ম্যাচেই শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়ে জার্মানি।

আরও অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, ১৯৮২ সালে স্টিলিকের সেই মিসের পর ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ম্যাচ পর্যন্ত বিশ্বকাপের কোনো টাইব্রেকারে আর একজন জার্মান ফুটবলারও পেনাল্টি মিস করেননি।

আধিপত্য ছিল জার্মানির, কিন্তু জিতল প্যারাগুয়ে

কাগজে-কলমে এবং মাঠের পরিসংখ্যানে জার্মানিই ছিল অনেক এগিয়ে। ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল তারা। ৯২ শতাংশ সফলতায় ৭৫৩টি পাস সম্পন্ন করে। গোলের উদ্দেশ্যে শট নেয় ২১টি। বিপরীতে প্যারাগুয়ের ছিল মাত্র ৭টি শট। কিন্তু ফুটবল সব সময় পরিসংখ্যানের খেলা নয়।

অতিরিক্ত সময়ে মনে হচ্ছিল ইতিহাস হয়তো আগের পথেই হাঁটবে। ১০২ মিনিটে কর্নার থেকে হেড করে জাল খুঁজে পান জোনাথন তাহ। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল হয়। গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে বাধা দেওয়ার কারণে গোলটি স্বীকৃতি পায়নি। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব চলে যায় টাইব্রেকারের হাতে।

যে অস্ত্র কখনও জার্মানিকে নিরাশ করেনি, সেদিন সেটিই মুখ ফিরিয়ে নিল। টাইব্রেকারের শুরুটাই ছিল অপ্রত্যাশিত।

প্রথম শট নিতে এসে কাই হাভার্টজের প্রচেষ্টা রুখে দেন অরল্যান্ডো গিল। অন্যদিকে প্যারাগুয়ের হয়ে প্রথম শটেই গোল করেন মৌরিসিও।

এরপর জার্মানির হয়ে জশুয়া কিমিখ, জামাল মুসিয়ালা ও নাদিয়েম আমিরি গোল করলেও নিক ভোল্টেমাডের শটও ঠেকিয়ে দেন গিল।

ম্যাচ গড়ায় সাডেন ডেথে। সেখানে জোনাথন তাহ গোল করতে ব্যর্থ হন। আর প্যারাগুয়ের হয়ে হোসে কানালে ঠান্ডা মাথায় জালে বল পাঠিয়ে ইতিহাস লিখে ফেলেন।

স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-৩। জার্মানির ৪৪ বছরের অজেয় সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এক রাতেই।

তবুও জার্মানির রেকর্ড ঈর্ষণীয়। এই পরাজয়ের পরও বিশ্বকাপের টাইব্রেকারের ইতিহাসে জার্মানির পরিসংখ্যান অসাধারণ।

পাঁচটি টাইব্রেকারে তারা মোট ২৪টি পেনাল্টি নিয়েছে। এর মধ্যে সফল হয়েছে ২০টিতে। এই ম্যাচের আগে ব্যর্থতা ছিল মাত্র একটি। কিন্তু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে এক ম্যাচেই তিনটি শট থেকে গোল করতে পারেনি তারা। হাভার্টজ ও ভোল্টেমাডের শট রুখে দেন অরল্যান্ডো গিল। সাডেন ডেথে ব্যর্থ হন জোনাথন তাহ।

শুধু খেলোয়াড়রাই নন, জার্মান গোলরক্ষকেরাও টাইব্রেকারে ছিলেন কিংবদন্তি। পাঁচটি বিশ্বকাপ টাইব্রেকারে প্রতিপক্ষের ২৪টি শটের মধ্যে ১০টি গোল হতে দেননি তারা। এর মধ্যে আটটি ছিল দুর্দান্ত সেভ এবং দুটি ছিল প্রতিপক্ষের মিস।

এমনকি ম্যাচ চলাকালীন পাওয়া পেনাল্টিতেও জার্মানির সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপে ম্যাচের ভেতরে পাওয়া ১৪টি পেনাল্টির মধ্যে ১২টিই গোল করেছে তারা।

জার্মানির জন্য এটি কেবল আরেকটি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নয়। এটি এমন এক মানসিক আধিপত্যের অবসান, যা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিপক্ষকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। ফুটবলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য টাইব্রেকার দল হিসেবে যে পরিচয় জার্মানি এতদিন ধরে বয়ে বেড়িয়েছে, সেই পরিচয়েরও ইতি টেনে দিল প্যারাগুয়ে।

৪৪ বছরের এক অজেয় সাম্রাজ্যের পতন হলো। আর বিশ্ব ফুটবল পেল নতুন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।