একদিকে কোডি গাকপোর কদিন আগেই সন্তান হারানোর বুকভাঙা ব্যক্তিগত বেদনা, অন্যদিকে মরক্কোর শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। শেষ পর্যন্ত ফুটবল যেন বেছে নিল আরও এক নাটকীয় সমাপ্তি। মন্তেরেইয়ের রাতটা ডাচদের জন্য হয়ে রইল আরেকটি অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প, আর মরক্কোর জন্য ইতিহাস ছোঁয়ার আরেকটি সোনালি অধ্যায়।
জার্মানি–প্যারাগুয়ে ম্যাচের মতোই নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলের সমতা, অতিরিক্ত সময়েও অমীমাংসিত। এরপর স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকার। সেখানে একের পর এক মিসে জমে ওঠে চরম উত্তেজনা। অবশেষে ৩-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে মরক্কো, আর হতাশার ভার নিয়ে মাঠ ছাড়ে নেদারল্যান্ডস।
প্রথমার্ধ এবং দ্বিতীয়ার্ধের বেশ কিছুটা সময়জুড়েই আক্রমণে বেশি ধারালো ছিল মরক্কো। একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও শেষ স্পর্শে ব্যর্থ হওয়ায় গোলের দেখা পাচ্ছিল না আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। নেদারল্যান্ডসও নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে লড়াই করেছে, তবে ম্যাচের বড় অংশজুড়েই প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে হয়েছে তাদের।
৭২ মিনিটে হঠাৎই বদলে যায় দৃশ্যপট। ক্রিসেনসিও সামারভিলের দারুণ প্রচেষ্টায় বক্সের ভেতরে বল পেয়ে জোরালো শটে জাল কাঁপান কোডি গাকপো। গোলের পর তাঁর উদযাপন ছিল অন্যরকম। হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি, চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গভীর আবেগ। কয়েক দিন আগেই অনাগত সন্তানকে হারানোর ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও দলের পাশে ছিলেন ডাচ ফরোয়ার্ড। সেই কঠিন সময়ে করা গোলটি যেন শুধু স্কোরশিটে নাম লেখানো নয়, ছিল এক বাবার নীরব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। সতীর্থরাও ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন, ভাগ করে নেন সেই আবেগঘন মুহূর্ত।
গাকপোর সেই গোলেই যখন নেদারল্যান্ডস জয়ের খুব কাছে, তখনই নাটকের শেষ অঙ্কটি লিখে রাখে মরক্কো। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে বাঁ দিক থেকে শেমসদিন তালবির ভাসানো ক্রসে ভার্জিল ফন ডাইকের ডিফেন্সিভ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হেডে বল জালে পাঠান ইসা দিওপ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ডাচ শিবির, আর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় মরক্কো।
এরপর আরও নাটক হতে পারত। যোগ করা সময়ের একেবারে শেষদিকে সুফিয়ান রাহিমির সামনে ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। প্রায় গোলমুখে একা পেয়েও বার্ট ভারব্রুগেনকে পরাস্ত করতে পারেননি তিনি। সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও দুই দল মরিয়া চেষ্টা চালালেও আর কোনো গোল আসেনি।
শেষ পর্যন্ত সব হিসাব মিটল টাইব্রেকারে। কিন্তু সেখানে যেন গোল করার চেয়ে মিস করাই ছিল সহজ। নেদারল্যান্ডস তিনটি এবং মরক্কো দুটি পেনাল্টি নষ্ট করে। সেই অবিশ্বাস্য স্নায়ুযুদ্ধ শেষে শেষ হাসিটা হাসে মরক্কোই। ৩-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেয় তারা।
কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো আবারও প্রমাণ করল, বিশ্বাস, লড়াই আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানার মানসিকতা থাকলে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। মন্তেরেইয়ের রাত তাই মনে থাকবে একদিকে অসমাপ্ত ডাচ স্বপ্নের জন্য, অন্যদিকে মরক্কোর দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের অমর কাব্য হিসেবে।








