প্রতিষ্ঠার পর চার দশক পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ১ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে শেষ প্রায় দুই দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকে দলটি এখন আবার ক্ষমতায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই নানামুখী পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে বিএনপিকে। দলটির নেতারা অবশ্য বলছেন, আগেও অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে তাঁদের দল। এবারও সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফল হওয়ার প্রত্যয় তাঁদের কণ্ঠে।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপিকে ‘চ্যাম্পিয়ন দল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি গতকাল সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিএনপির অতীত গৌরব ও অবদান দেশের রাজনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন-উৎপাদন এবং আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গণতন্ত্রের প্রতিটি সংকটে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও দলটির নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগ রয়েছে।
বিএনপি ও সরকারের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে রিজভীর মন্তব্য, ‘চ্যালেঞ্জ থাকবেই। যে কাজের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে না, সেটা তো উন্নত কাজ নয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর গত ছয় মাসে অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসন, পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছে সরকার। ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ এগিয়ে চলছে।
যদিও সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, প্রশাসনে সমন্বয়, দলীয় প্রভাব এবং কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আছে বলছেন তাঁরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী যে প্ল্যানের কথা বলেছেন, স্বপ্নের কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, উনি যে বার্তা দিতে চাচ্ছেন, উনার মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে উপদেষ্টা ও নেতা-কর্মীদের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পাশাপাশি হামলা-মামলা, নির্যাতন, বাধা-বিপত্তি ও নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে বিএনপি। একসময় বিএনপি ‘শেষ হয়ে যাবে’, এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিল কারও কারও মনে। অথচ ঘুরে দাঁড়িয়ে সেই বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। প্রতিষ্ঠার সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে লক্ষ্য নিয়ে দল গড়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া তা এগিয়ে নিয়েছেন এবং এখনো সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে বিএনপি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা গেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে। দ্রব্যমূল্য এখনো মানুষের প্রধান উদ্বেগের একটি। মূল্যস্ফীতি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাজারে তার সুফল কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ, জ্বালানিসংকট ও লোডশেডিং নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অপরাধ দমনে অগ্রগতির কথা বলছে। তবে বিরোধী দল ও সমালোচকদের মতে, এ ক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে দলটি সরকারকে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার অভিযোগও করেছে।
এদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠন ধরে রেখেছে। সেই সাংগঠনিক শক্তি বড় ভূমিকা রেখেছে ছয় মাস আগের নির্বাচনে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের ভূমিকা বদলে গেছে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় নেতা-কর্মীদের প্রধান কাজ ছিল আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া। এখন তাঁদের বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্প, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন করার পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতায় আসার পর দল ও সরকার কার্যত একাকার হয়ে গেছে। যদিও এমন সমালোচনাকে ‘মুখরোচক কথা’ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে দাবি করছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আজকের পত্রিকাকে বলেন, দল দলের জায়গায় আছে। দলের নেতৃত্ব সরকারে আছেন, সরকার পরিচালনা করছেন। দল আর সরকার একাকার হয়ে গেছে, এটা বলা ঠিক হবে না।
দল ও সরকার হিসেবে বিএনপির কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলছেন, ‘আমার মনে হয়, বিএনপি যা করছে, তার চেয়ে ভালো করতে হবে। দলে যদি গণতন্ত্র না থাকে, দেশেও গণতন্ত্র হবে না। দলে প্রথমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে হবে। তা না হলে যে লাউ, সেই কদুই হবে।’
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কর্মসূচি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকালে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া উপযুক্ত দিনে মৎস্য অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হবে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠাই নয়, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছে, করছে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায়।








