ঢাকাই সিনেমার মাদার অর্গানাইজেশন বলা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রখ্যাত নির্মাতা খান আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল এ সংগঠন। যদিও স্বাধীনতার আগে থেকেই এ সংগঠনটি ছিল, তখন নাম ছিল পাকিস্তান প্রযোজক সমিতি। তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিকাল ৫টায় নতুন নামে, নতুন উদ্যমে, নতুন সদস্যদের নিয়ে পথচলা শুরু করে সংগঠনটি। খান আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এ সংগঠনের নতুন কার্যক্রম শুরু করার সময় তার সঙ্গে ছিলেন জহির রায়হান, আবদুল জব্বার খান, আলমগীর কুমকুম, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান, আজিজুর রহমান বুলি, এস এম পারভেজ, আবুল খায়ের, এ ই আর খান, কামালউদ্দিন আহমেদ, ফখরুল আলম, আবদুল হামিদ, মো. সিরাজউদ্দিন, ওবায়দুল ইসলাম মিলন, হায়দার আলী, ইবনে মিজান, নুরুল আজিম, রওনক চৌধুরী, নিরঞ্জন সাহা’র মতো প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজকরা। এর প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন খান আতাউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নির্মাতা-প্রযোজক আজিজুর রহমান বুলি। বর্তমানে এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংগঠন। এর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি দুবছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংগঠন পরিচালনা করেন। সংগঠনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই। প্রায় সাত বছর বিরতির পর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন খোরশেদ আলম খসরু এবং সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল আলম। তাদের নেতৃত্বে ২০১৯-২০২১ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এরপর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুবছর পর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২১ সালে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সদস্যপদ হালনাগাদ, ভোটার তালিকা নিয়ে আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা, করোনা মহামারির প্রভাব এবং পরবর্তী সময়ে সমিতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সব মিলিয়ে নির্বাচন বারবার পিছিয়ে যায়। একপর্যায়ে নেতৃত্বের বৈধতা ও নির্বাচন আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই সময়ের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ করা প্রশাসক সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি এ সমিতির নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্বাচনে দুটি প্যানেলের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেয় দুই পক্ষ। একটি প্যানেলের নেতৃত্বে রয়েছেন অভিনেতা-প্রযোজক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল ও প্রযোজক কামাল কিবরিয়া লিপু। অন্য আরেকটি প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু ও সামছুল আলম। আগামী ৮ আগস্ট এফডিসিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তার আগেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। নির্বাচন কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সামছুল আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল করে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, তারা গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ করতে পারেননি। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫-এর ১৮(৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদ নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করলে অন্তত এক মেয়াদ বিরতি না দিয়ে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ বিধান অনুসারেই খোরশেদ আলম খসরু ও সামছুল আলমের মনোনয়ন প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। ৫ জুলাই ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ৪০ জন বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিবের সই করা পৃথক এক বিজ্ঞপ্তিতে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে এ দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও খসরু-সামছুল পক্ষ এ সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে আপিলের কথা জানায়। ফলে ভোটের আগেই নির্বাচন আবারও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

প্রযোজক সমিতির সাম্প্রতিক সংকট মূলত দুটি পক্ষের অবস্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। একদিকে সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু ও তার অনুসারীরা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ দাবি করছে, গঠনতন্ত্রের বাইরে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি এখন শুধু ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়; বরং গঠনতন্ত্রের ব্যাখ্যা ও নির্বাচন পরিচালনার স্বচ্ছতাকে ঘিরেও বিতর্কে রূপ নিয়েছে। যদিও একই ঘটনার জন্য ২০১৩ সালের পর ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এ দীর্ঘ অচলাবস্থার মূল কারণ ছিল সমিতির ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ, সদস্যপদ বাতিলসংক্রান্ত জটিলতা এবং এর ফলে সৃষ্ট একাধিক আইনি মামলা। এ আইনি জট ও জটিলতার কারণে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংগঠনটিতে প্রশাসক নিয়োগ করতে বাধ্য হয়।

প্রযোজক সমিতির নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে বেশ কিছু যোগ্যতা থাকতে হয়। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণভাবে একজন প্রার্থীকে সমিতির বৈধ সদস্য হতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সদস্যপদ ও চাঁদা হালনাগাদ রাখতে হবে। মনোনয়নপত্র যথাযথভাবে পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। প্রযোজক হিসাবে গঠনতন্ত্রে বর্ণিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। কোনো শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা বা অযোগ্যতার আওতায় থাকা যাবে না। সর্বোপরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাণিজ্যিক সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না করলে নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন বাতিল করতে পারে। নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমার পর নির্বাচন কমিশন যাচাই-বাছাই করে। এ সময় সদস্যপদের বৈধতা, আর্থিক বকেয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, গঠনতন্ত্রের শর্ত পূরণ, আপত্তির নিষ্পত্তি-এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়। কোনো শর্তে ঘাটতি পাওয়া গেলে কমিশন মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতা রাখে। বাতিলের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিলের সুযোগও থাকে।

বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গনে নির্বাচন ঘিরে প্রার্থিতা বাতিল নতুন নয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ২০২২ সালের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন। সেখানে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর আপিল বোর্ড জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে নিপুণ আক্তারকে বিজয়ী ঘোষণা করে। পরে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং একাধিক আদালতের আদেশে নির্বাচনপরবর্তী দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। তবে প্রযোজক সমিতির বিষয়টি আরও একটু জটিল। মনোনয়ন বাতিল হওয়া খোরশেদ আলম খসরুসহ কয়েকজনকে ২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এফডিসির সামনে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন তারা। পরবর্তী সময়ে বিচারে একাধিক মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন জেলের সাজার রায় হলেও তাকে আকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য জুলাইবিরোধী সিনেমা অঙ্গনের এসব ব্যক্তিদের এখনো কোনো শাস্তি পেতে হয়নি।

প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। কিন্তু নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, নির্বাচন বিলম্ব এবং মনোনয়ন বিতর্ক সমিতির কার্যক্রমকে দুর্বল করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গঠনতন্ত্রের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা এবং সব পক্ষের আস্থা অর্জন ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অন্যথায় সাত বছর পর আয়োজিত নির্বাচনও নতুন আইনি ও সাংগঠনিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো সিনেমা শিল্পেই।