রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাস এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৮ হাজার গাছ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাগজে-কলমে গাছ থাকলেও বাস্তবে তা নেই। রামেবির একটি প্রভাবশালী চক্র গাছগুলো হজম করে ফেলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানতে পেরেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তিনি বিষয়টি নিয়ে রামেবির উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক জাওয়াদুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন।
দুপুরের মধ্যেই ভিসি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বিক্রি করা গাছের হিসাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তিন দফায় তিনি ২ হাজার ৬৪২টি গাছ নিলামের মাধ্যমে ২৬ লাখ ১২ হাজার ৫৭০ টাকায় বিক্রি করেছেন। এসব গাছ কাটা হয়েছে। আর কোনো গাছ কাটা হয়নি বলে তিনি মন্ত্রীর কাছে দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আরও অনেক গাছ টেন্ডারের বাইরেই লুট হয়েছে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে।
নগরের সিলিন্দা এলাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ৬৭ দশমিক ৬৭৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করে জেলা প্রশাসন। ২০২৩ সালের ১ জুন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শরিফুল হক ক্ষতিপূরণের প্রাক্কলন প্রস্তুতের বিবরণ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে একটি চিঠি দেন।
এই চিঠিতে গাছের মোট সংখ্যা বলা হয় ২৫ হাজার ৮৪২টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৯৬৩টি ছিল কলাগাছ। আর আমগাছ ছিল ৫ হাজার ৮৩২টি। মেহগনি ছিল ৪ হাজার ৮৮২টি। এর বাইরে লম্বু ২৪১টি, লেবু ১২৭টি, নিম ১১৭টি, সজনে ৯১টি, পেঁপে ৮৮টি, খেজুর ৫৭টি, থুজা ৪৫টি, লিচু ৫৭টি, চালতা ৩০টি, পেয়ারা ২৯টি, সেগুন ২৭টি, বাবলা ২৫টি, নারকেল ২৪টি, কাঁঠাল ২৩টি, চাম কড়াই ২১টি, মিনজিরি ২৩টি, জলপাই ১৬টি, ডালিম ২৩টি, জাম ২০টি, আকাশমণি ১৪টি, সুপারি ১২টি, ডুমুর ১১টি, আমড়া ১০টি, জামরুল ১০টি, জামরুল ১০টি, কাঠবাদাম ৯টি, তেঁতুল ৮টি ও অর্জুন ৭টি। প্রতিটি কলাগাছ কেনা হয় সর্বনিম্ন ৫০০ টাকায়। এভাবে সবগুলো গাছ অধিগ্রহণ করতে খরচ হয় ২ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ১ টাকা।
ভূমি অধিগ্রহণের সময় সেখানে থাকা সব ধরনের গাছের বয়স এবং গাছের কাঠ বা খড়ির হিসাব করে মূল্য নির্ধারণ হয়। সে অনুযায়ী শুধু কলাগাছ ছাড়া বাকি সবই কাঠ বা খড়ি হিসেবে নিলামে বিক্রি হওয়ার কথা। কলাগাছ বাদ দিলেও মোট গাছ হওয়ার কথা ১১ হাজার ৮৭৯টি। আর নিলামে ২ হাজার ৬৪২টি বিক্রির পর গাছ থাকার কথা ৯ হাজার ২৩৭টি। অথচ এখন প্রকল্প এলাকায় এক হাজারের বেশি গাছ নেই।
এখন কাগজের সঙ্গে গাছের হিসাব না মেলার কারণে ভিসি ডা. জাওয়াদুল হকের কাছে হিসাব চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রামেবি সূত্র জানায়, গতকাল সকালে রামেবি ক্যাম্পাসের এই গাছের বিষয়ে জানতে ভিসিকে ফোন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই। ক্যাম্পাসে কত গাছ ছিল, কত বিক্রি করা হয়েছে এবং এখন কত গাছ আছে, তা তিনি জানতে চান। ভিসি তখন জানান, তিনি ২ হাজার ৬৪২ গাছ বিক্রি করেছেন। কিন্তু কত গাছ ছিল আর এখন কত আছে, তা তিনি জানেন না। এতে বিরক্তি প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তখন নথিপত্রে বের করে দেখা যায়, মোট গাছ ছিল ২৫ হাজার ৮৪২টি।
মন্ত্রীর ফোনকলের পর সকালেই ক্যাম্পাস পরিদর্শনে যান ভিসি ও প্রকল্প পরিচালক ডা. জাওয়াদুল হক। বিষয়টি স্বীকার করে গতকাল দুপুরে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের ফোন পেয়ে আমি নিজেই প্রকল্প এলাকায় গিয়েছিলাম। আমার কাছেও মনে হচ্ছে, এক হাজারের মতো গাছ আছে। বাকি গাছ কোথায় গেল, সেটা আমিও বুঝতে পারছি না।’ নিলামে গাছ কেনা তিনটি প্রতিষ্ঠান কেনার অতিরিক্ত গাছ কেটেছে কি না, জানতে চাইলে ভিসি জাওয়াদুল হক বলেন, ‘গাছের প্রকৃত সংখ্যা জানতে আমি উপসহকারী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি গুণে এসে আমাকে জানাবেন। আমিও মন্ত্রী মহোদয়কে এ কথা জানিয়েছি।’
প্রায় ৮ হাজার গাছ তাহলে কোথায় গেল, এমন প্রশ্নে ভিসি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের সময় লোকজন অতিরিক্ত গাছের সংখ্যা বলেন মূল্য বেশি পেতে। এই ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে।
রামেবি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত বছর কোনো টেন্ডার ছাড়াই রামেবির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে প্রকল্প এলাকায় গাছ কাটা শুরু করে বালু ভরাটের কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু হাফিজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হাফিজুল একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী এক নেতার ঠিকাদারি কাজ দেখভাল করতেন। ওই নেতা তখন ক্যাম্পাসের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছিলেন। এই গাছ কাটা নিয়ে গত বছরের ২১ আগস্ট আজকের পত্রিকায় ‘কর্মকর্তাদের যোগসাজশে লুট ক্যাম্পাসের গাছ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হলে গাছ কাটা বন্ধ হয়। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে গাছ নিলাম শুরু হয়।
নিলামপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে গত বছরের ২০ আগস্ট এই প্রতিবেদক ক্যাম্পাস এলাকা ঘুরে দেখেন।
সেদিন দেখা যায়, ক্যাম্পাসের পূর্ব পাশ দিয়ে ড্রেনের সঙ্গে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করতে কয়েক শ গাছ কাটা হয়েছে। সেদিন পুরো ক্যাম্পাসে কাটা গাছের চিহ্ন দেখা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১০ বিঘা আয়তনের একটি বাগানে অর্ধশতাধিক আমগাছ কাণ্ড থেকে কাটা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেদিন স্থানীয়রা জানান, আরও ১০ মাস আগে থেকে গাছ কেটে ট্রলি ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
২১ আগস্ট আজকের পত্রিকায় ‘কর্মকর্তাদের যোগসাজশে লুট ক্যাম্পাসের গাছ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হলে গাছ কাটা বন্ধ হয়।
তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে তিন দফায় ২ হাজার ৬৪২টি গাছ বিক্রি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিলামে গাছ কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও রামেবির শক্তিশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ক্রয়কৃত গাছের অতিরিক্ত কেটে নেয়। এ কারণে এখন প্রায় ৮ হাজারের বেশি গাছের হদিস মিলছে না। প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের এসব গাছ ওই সিন্ডিকেট হজম করেছে। ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক সব জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, শুরু থেকেই রামেবি স্থাপন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এ কারণে এখনো পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত শুধু প্রধান ফটক দৃশ্যমান হয়েছে।







