ইতিহাস, ঐতিহ্য, জ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গৌরবময় উত্তরাধিকার ধারণ করে প্রতিষ্ঠার ৭৪ বছরে পদার্পণ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। সাত দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও গবেষণা, আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রত্যাশার কথা বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু মেধাবী গ্র্যাজুয়েট তৈরিতেই নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও সাহসী ভূমিকার মাধ্যমে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য গড়ে তুলেছে।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সমাজ-রাষ্ট্র গঠনে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান জাতীয় পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ ৭৩ বছরের পথচলায় অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রশাসক, বিচারপতি, রাজনীতিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বিভিন্ন পেশার কৃতী মানুষ তৈরি করে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে এই বিদ্যাপীঠ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন, শতভাগ আবাসিক সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং আধুনিক, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী, শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এবং ১৭টি আবাসিক হল রয়েছে। তবে ৭৩ বছরের পথচলার পরও আবাসন সংকট, সীমিত গবেষণা বরাদ্দ এবং অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
গবেষণায় আরো বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, “গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য আরো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।”
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আবাসন সংকট। নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, সুষ্ঠু সিট বণ্টন, উন্নত গবেষণা পরিবেশ, আধুনিক গ্রন্থাগার, নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার রিয়া বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন ও পরিচয়ের অংশ। আমরা চাই গবেষণার আরও প্রসার, আধুনিক শিক্ষা-সুবিধা, আবাসন সমস্যার সমাধান এবং একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিকশিত হবে।”
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব ইসলাম বলেন, “শতভাগ আবাসিকতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বৃদ্ধি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিট বাণিজ্য বন্ধ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।”
প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ বছরের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের জন্য গর্বের। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা, আবাসন সংকটের সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি ক্যাম্পাসে পরিণত হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে যাবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, গবেষণার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি স্থাপন, আলোকায়ন বৃদ্ধি এবং গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
৭৩ বছরের গৌরবময় পথচলা শেষে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।








