গত কয়েক বছরের ব্যবসায় মন্দা, আয় কমে যাওয়া, এআইসহ নানা কারণে বিভিন্ন দেশের নানা প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হেঁটেছে। কিন্তু একটু প্রতিষ্ঠান ব্যতিক্রম। প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পরও কোনো কর্মী ছাঁটাই করেনি কোম্পানিটি। কর্মী ছাঁটাই ছাড়াই টানা ৭৫ বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। কোম্পানিটির নাম ‘দ্য গান্ড কোম্পানি’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রিক্যাল ম্যাটেরিয়ালস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।
১৯৫১ সালে এড গান্ড এই পারিবারিক কোম্পানির যাত্রা শুরু করেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত একজন কর্মীও ছাঁটাই করেনি। সাবেক ক্যান্ডি বিক্রেতা এড গান্ডের হতে গড়া কোম্পানির সাফল্য দেখতে এবং ব্যবসায়িক মডেল শিখতে সেন্ট লুইসে ভিড় জমান বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নির্বাহী ও সিইও।
কোম্পানির নেতৃত্বে এখন আছেন ৫৫ বছর বয়সী স্টিভ গান্ড, প্রধান নির্বাহী হিসেবে। তিনি ওই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর বড় ভাই রিচের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। রিচ এখন কোম্পানির চেয়ারম্যান ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওয়াল স্টিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী নিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রয়মূল্য ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। জেনারেল ইলেকট্রিক এবং রকওয়েল অটোমেশনের মতো প্রধান গ্রাহকদের পরিষেবা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক দশক ধরে গড়ে বার্ষিক ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মুনাফার মার্জিনও দ্বিগুণ করেছে।
স্টিভ গান্ড ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘শুনতে আবেগপ্রবণ মনে হলেও, এটি লাভজনক।’
অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর্মী ছাঁটাই করার পরিবর্তে, কোম্পানিটি সারা বছর তার কর্মী সংখ্যা কম রাখে। তাদের ১২ ধাপের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার অধীনে, কোম্পানিটি কারখানার দেয়ালে আর্থিক ফলাফল প্রদর্শন করে, কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত কর্মজীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং সুপারভাইজারদের কারখানার মেঝেতে টহল দিতে বাধ্য করে। কর্মীরা কারখানার মেঝেতে থাকা লাল কার্ড ব্যবহার করে কার্যক্রম-সংক্রান্ত নানা উদ্বেগ ও সমাধান জমা দেয়, যা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সমস্যার সমাধান না করা পর্যন্ত এই লাল কার্ড প্রদর্শিতই থাকে।
‘আপনি যদি শোনেন, লোকেরা আপনাকে মতামত দেবে এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে যদি আপনি পদক্ষেপ নেন তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবেই হবে’—বলেন স্টিভ গান্ড।
১৯৫১ সালে সাবেক ক্যান্ডি বিক্রেতা এড গান্ডের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্টিভ এবং রিচ গান্ড পূর্ণকালীন কর্মী হিসেবে যোগ দেন, তখন কোম্পানির বার্ষিক বিক্রয় ছিল ২৭ লাখ ডলার। কর্মীর সংখ্যা ছিল ২০ জন, যাঁদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন গান্ড পরিবারের সদস্য।
এড গান্ডের বাবা পল গান্ড যিনি শুরুর দিকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি কর্মিসংখ্যা কমানোকে নির্বাহী ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখতেন। পরে ২০০৯ সালে কোম্পানিটি একটি কর্মচারী স্টক মালিকানা পরিকল্পনা চালু করে, যা গত বছর নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে মার্কিন কর্মীদের ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা প্রদান করে।
পেট্রোবাংলার অধীনে ৭৫৩ পদে নিয়োগ, ঘরে বসে আবেদনের নিয়ম জানুনকোম্পানিটি অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির ওপর জোর দেয় বাইরে থেকে কর্মী আনার চেয়ে। ৩৩ বছর বয়সী ডেইড্রা জোনাস ১৬ বছর আগে একজন শিক্ষানবিশ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখন তিনি পদোন্নতি পেয়ে মেশিন পরিচালনা, অভ্যর্থনা এবং গ্রাহক পরিষেবার পাশাপাশি কর্মীদের মতামত শোনার অধিবেশন পরিচালনার কাজ করছেন।
জোনাস বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাগুলো এখন এমন, যা আমার পরিবারের কেউই কখনো ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ভাবেনি।’
এমন নানা সাফল্যের গল্পও আছে প্রতিষ্ঠানটিতে। তাই তো ২০০টির বেশি কোম্পানির নেতারা এই কোম্পানির পরিচালনা পদ্ধতি তাদের জন্য কার্যকর হবে কি না, তা দেখতে তা দ্য গান্ড কোম্পানির কারখানাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ওহাইও-ভিত্তিক ওয়েল্টি এন্টারপ্রাইজেসের প্রধান নির্বাহী ডন টেলর তাঁর ছেলে মাইকেলকে নিয়ে পদ্ধতিগুলো পর্যালোচনা করতে উইসকনসিনে গান্ডের একটি কারখানা পরিদর্শন করেন। ডন টেলর বলেন, ‘আশা করি, আমরা এর কিছু অংশ অনুকরণ করতে পারব।’
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই এই মডেলের কিছু অংশ ব্যবহার করা শুরু করেছে। নির্বাহীদের এই সফর সত্ত্বেও স্টিভ গান্ড বলেন, সফরকারী খুব কম কোম্পানিই সম্পূর্ণ ১২ ধাপের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করে। তিনি উল্লেখ করেন, করপোরেট নির্বাহীরা প্রায়ই নিজেরা পরিবর্তন আনার পরিবর্তে এই দায়িত্ব মানবসম্পদ বিভাগের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কাজ করে থাকেন।
পিএসসির অধীনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়–অধিদপ্তরে চাকরি, ১৩৫ পদের মধ্যে বেশি সাব-রেজিস্ট্রারেব্যবসার সাফল্যের নেপথ্য কী
অনেকে কোম্পানিটিকে ‘মানবিক বা মানবিক নেতৃত্বের গল্প’ হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত কৌশলী খরচ ও পরিচালন কাঠামোরই ফলাফল। ব্যবসায়িক চাহিদার তুঙ্গে থাকার সময়ে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ না করাই গান্ডের ‘নো-লেঅফ’ বা ‘কর্মী ছাঁটাই’ না করার রেকর্ডের মূল চাবিকাঠি।
প্রতিষ্ঠানটি ওভারটাইম, মুনাফা-শেয়ারিং এবং স্বাভাবিক কর্মী চলে যাওয়ায় নমনীয়তার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেকোনো সাধারণ কারখানায় চাহিদার পারদ নেমে গেলে ওভারটাইম কমানো এবং নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত শ্রমের সময় কমানো সম্ভব, যা সাধারণ কোনো অর্থনৈতিক মন্দা সামলে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কর্মীদের জীবনমান ও মালিকানার সুযোগ
গান্ডের সাফল্য কেবল পরিচালন নীতির সঙ্গে কর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় বেতন ও মালিকানার সুযোগ। কারখানা পর্যায়ের একজন শিক্ষানবিশ কর্মী ওভারটাইম ও প্রফিট-শেয়ারিং ছাড়াই বছরে গড়ে ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদের বেতনের স্কেল অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশ করা হয় এবং আর্থিক হিসাবের বিবরণী মিটিং রুমের দেয়ালে টানানো থাকে।
২০০৯ সালে চালু করা ‘এমপ্লয়ি স্টক ওনারশিপ প্ল্যানের’ মাধ্যমে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন। সম্প্রতি চীনসহ অন্যান্য দেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক কর্মীদেরও এই মালিকানার আওতায় আনতে কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী এক নতুন শেয়ার প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছেড়ে যাওয়ার হার ১০ শতাংশেরও কম।
পর্যটন করপোরেশনের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ কোর্স, ভর্তি ফি–আবেদনের যোগ্যতা কীঅন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে যেভাবে গান্ড আলাদা
লিংকন ইলেকট্রিক, নিউকোর কিংবা ব্যারি-ওয়েহমিলারের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাঁটাইবিহীন নীতি বজায় রাখার জন্য পরিচিত। তবে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দায় বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলে ওই কোম্পানিগুলোকে অবৈতনিক ছুটি বা কর্মঘণ্টা ৩০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার পথ বেছে নিতে হয়েছিল। সেখানে গান্ড কোম্পানি তাদের টানা প্রবৃদ্ধি ও ইলেকট্রিক্যাল ডিভাইসের বৈশ্বিক উচ্চ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক ভারসাম্য ধরে রেখেছেন।
চ্যালেঞ্জটা ভবিষ্যতে
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সাফল্যের সামনে কিছু উদীয়মান চ্যালেঞ্জও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যবস্থাপকদের এক বৈঠকে উঠে এসেছে সে তথ্য। কর্মীরা ওভারটাইম শিফটে কাজ করতে আগের চেয়ে কম আগ্রহী। যদি কর্মচারীরা ওভারটাইম না করেন, তবে সর্বোচ্চ চাহিদা সামলাতে প্রতিষ্ঠানকে নতুন কর্মী নিতে হবে, যা নমনীয়তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ব্যবসার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে প্রয়োজনীয় দক্ষ লিডার বা সুপারভাইজার তৈরির গতি কিছুটা ধীরগতির হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীনসহ মোট আটটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে একই কর্মীনীতি ও শেয়ার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা আইনগতভাবে জটিল হতে পারে।
বিশ্ববাজারে ইলেকট্রিক্যাল ট্রান্সফরমার ও পাওয়ার গ্রিড পণ্যের চাহিদা অব্যাহত থাকা পর্যন্ত গান্ডের এই রেকর্ড অক্ষুণ্ন থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানের মূল পরীক্ষাটি আসবে সেদিনই, যেদিন বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে, সেদিন।







