দেশের অর্থনীতির আগামী এক বছরের পথরেখা নির্ধারণ করে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। দেশ পরিচালনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই টাকা ব্যয় করবে সরকার। আজ থেকে নতুন এই বাজেট কার্যকর হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২৬’ পাশের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। এর আগে রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে নির্দিষ্টকরণ আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। সংসদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাজেট এখন আর কেবল সংখ্যার সমষ্টি নয়, এটি আগামী এক বছরের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, উন্নয়নের দিকনির্দেশনা এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাশার এক নতুন মানচিত্র।

এবারের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটের শিরোনাম ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকালে অধিবেশন শুরুর পর বাজেট পাশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। বাজেট পাশের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দাবি মঞ্জুরি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় ৪৩ জন সংসদ-সদস্য। মোট ছাঁটাই প্রস্তাব ছিল এক হাজার তিনশর বেশি। তবে সব প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়নি। সময় গুরুত্ব বিবেচনায় বিরোধী দল অনেক প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। কিছু প্রস্তাবের ওপর আলোচনা না করার বিষয়ে সম্মত হয় বিরোধী দল। তবে বিরোধী দলের কোনো প্রস্তাবই সংসদে পাশ হয়নি। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বাজেট কণ্ঠভোটে পাশ হয়। এ সময় সংসদনেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা টেবিল চাপড়ে বাজেট বাস্তবায়নের নতুন যাত্রাকে স্বাগত জানান।

মঞ্জুরি প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার জোহরের নামাজের বিরতির পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই মূলত প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। এটা একটা রেওয়াজ। রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি এবং আলোচনা গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে কারণে আমরা মূল্যবান সময়টা বাঁচাতে পারি কি না, আমাদের কোনো সুযোগ আছে কি না।’ তিনি বলেন, ‘ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো আমরা প্যাকেজ প্রত্যাহার করে নিলাম। তাহলে বোধহয় কাজটা সহজ হয়। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ধন্যবাদ বিরোধীদলীয় নেতা। আমার মনে হয় ট্রেজারি বেঞ্চ আপনার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।’ পরে ২৫টি মঞ্জুরি দাবি সরাসরি ভোটে দেওয়া হয়। এসব দাবি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এরপর ১৫ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাশ হয়। ১৬ জুন থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা। সংসদনেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সংসদ-সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। সরকারি দল জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ২৯ জুন শেষ হয় বাজেট বিতর্ক। এবাবের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ২৯১ জন সদস্য সংসদে ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা করেন। এর মধ্যে সরকারি দলের ২০০ এবং বিবোধী দল ও স্বতন্ত্র মিলে ৯১ জন। তবে সম্পূরক বাজেট যোগ করলে আলোচনা হয়েছে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। সেখানে বক্তার সংখ্যা আরও ২৫ জন বেড়ে ৩১৬ জনে দাঁড়াবে। প্রায় ১৫ দিন পর্যালোচনা, সমালোচনা ও পরামর্শের মধ্য দিয়ে সংসদের অনুমোদন পায় আগামী অর্থবছরের আর্থিক নকশা। এর আগে সোমবার জাতীয় সংসদে ‘অর্থবিল-২০২৬’ পাশের মাধ্যমে বাজেটের আর্থিক ও করসংক্রান্ত বিধিবিধানও অনুমোদিত হয়। প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় চূড়ান্ত বাজেটে আনা হয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা প্রথমে ২৫ হাজার বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। পরে সংসদের আলোচনার পর তা আরও ২৫ হাজার বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়। অর্থাৎ বছরে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করলে কোনো আয়কর দিতে হবে না। একইভাবে নারী, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণদের করমুক্তসীমাও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হয়েছে। এছাড়াও তিন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে।

ব্যয়, আয় ও ঘাটতি : এবারের বাজেটের মোট ব্যয়ের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৬৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে বিদেশি অর্থায়নের লক্ষ্য ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি এবং দেশীয় অর্থায়ন ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি অর্থায়নের মধ্যে ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি এবং অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশীয় অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংক ঋণ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।